আমার কলকাতা

যে কলকাতায় আমার জন্ম হয়েছিল, যেখানে বড় হয়েছি, অল্পদিনের জন্য কাজও করেছি, আজ সেই শহর কে খুঁজে পাওয়া কঠিন। অনেকই বদলে গেছে আমার শৈশব-কৈশোরের কলকাতা।

শৈশবের কথা ভাবলেই মনে পড়ে স্কুলে ভর্তি হওয়া। আজকের শিশুদের তুলনায় আমরা অনেক ভাগ্যবান ছিলাম। না ছিল কোন বিরাট পরীক্ষা, না ছিল লটারি।  সামান্য কিছু মৌখিক প্রশ্নের উত্তর আর এক পাতা শ্রুতিলিখন, ব্যস। আমাদের নতুন স্কুল বাড়ি তখনও তৈরি হয়নি – পুরনো বাড়িটার বিশাল বিশাল জানালা ওয়ালা ঘরে ক্লাস। অনেক ছাত্ররা তো সেই জানালা দিয়েই যাওয়া আসা করতো।  স্কুলে টিফিন দেওয়া হতো  ছোট ছোট কাগজের বাক্সে – একেকদিন একেক রকম। বেশ মনে পড়ে প্রতি বর্ষায় কলকাতা এখনকার মতোই ভাসতো, আর সেই সব দিনেই আমাদের স্কুলে যাওয়ার তাগিদ থাকতো বেশি। হাফ ছুটি তো বটেই – ডবল টিফিনও প্রায়ই। মনে হয় জীবনের সবচাইতে ভাল সময়টা স্কুলেই কেটেছিল।

অনেক কিছুর মধ্যে কলকাতা বললেই আমার মনে হয় ‘বই’। স্কুল থেকে দু’ পা হাঁটলেই সারি সারি পুরনো বইএর স্টল। সংখ্যায় অনেক কমে গেলেও এখনও আছে। শুধু কলেজ স্ট্রিটে নয়, পুরনো বইএর আরো অনেক ছোট বড় দোকান ছড়িয়ে ছিল শহরের সর্বত্রই। আমরা কয়েকজন এমন এমন সব দোকানের সন্ধান জানতাম যেগুলো অনেকেরই জানা ছিলনা। একদিন কি কারণে স্কুল ছুটি হয়ে যাওয়ায় আমরা দু’ বন্ধু বই কিনতে হেঁটেছিলাম কলেজ ষ্ট্রীট থেকে গোল পার্ক। Wodehouse-এর অনেকগুলো বই সেদিন একসঙ্গে পেয়ে  গিয়েছিলাম গড়িয়াহাট রোডের এক ফুটপাতের স্টলে । সেগুলো আজও আমার সংগ্রহে রয়েছে। এইভাবেই একবার বসুমতী সাহিত্যমন্দিরের সামনে পেয়েছিলাম ‘নির্বাসিতের আত্মকথা’।

বই পড়ার শখ মেটাবার একটা ভাল জায়গা ছিল আমাদের পাড়ার মৃণালিনী স্মৃতি পাঠাগার। পরিসর ছোট হলেও এর সংগ্রহ ছিল খুব ভাল। রোজ সন্ধ্যেয় একটা করে বই নিতাম। প্রথম প্রথম ওখানে বসেই শেষ করে তখনই বদলে নিতাম। লাইব্রেরিয়ান কার্তিক বাবু চটে গিয়ে নোটিশ দিলেন যে বই অন্ততঃ  একদিন রাখতেই হবে। তবে ক্যাটালগ লেখায় সাহায্য করায় উনি আমার ওপর সদয় হয়ে ভিতরে ঢুকে নিজে বই বাছার সুযোগ দিয়েছিলেন। আর তাই একদম পিছনের র‍্যাকে ইংরিজি বইএর এক সোনার খনির সন্ধান পেয়েছিলাম। দুঃখের কথা এই পাঠাগারটি আর নেই।

আর একটু যখন বড় হয়েছি, স্কুলের ওপরের ক্লাসে পড়ি, তখন তো নিত্য ঢুকে পড়তাম কলেজ ষ্ট্রীট বাটার দোকানের পাশে আমেরিকান লাইব্রেরিতে। ওঁদের খাতায় ইচ্ছেমতো কলেজের নাম লিখে দিতাম। গরমের দিনে এমন স্বর্গ আর কোথায় পাবো। এখানকার দারোয়ান থেকে শুরু করে লাইব্রেরিয়ানরা সবাই আমাদের বেশ চিনে গিয়ে ছিলেন। ওঁরা ভালই জানতেন আমরা কলেজ পড়ুয়া নই, কিন্তু কোনদিন ঢুকতে বাধা দেননি। প্রেমেন মিত্রের ‘মৌমাছির নাচ’ পড়ে এই লাইব্রেরিতেই এনসাইক্লোপিডিয়াতে ব্যাপারটা যাচাই করে পুলকিত হয়েছিলাম।

বইএর ব্যাপারে একটা নিদারুণ স্মৃতিও আছে। হঠাৎ খেয়াল হল আলিপুরের ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে গিয়ে বই পড়বো। জানতাম না ওঁদের এক অদ্ভুত নিয়মের কথা। ওখানে গিয়ে জানলাম যেহেতু আমরা ১৪ পেরিয়েছি অথচ সতেরোয় পড়িনি আমরা না যেতে পারব  ছোটদের না বড়দের বিভাগে! কি আর করি, মনের দুঃখে পুকুর থেকে দুটো শাপলা ফুল তোলার দায়ে পেশ হলাম স্বয়ং ডাইরেক্টরের কাছে। মনে আছে, আমাদের যুক্তি মেনে নিতে হয়েছিল তাঁকে। তবে সেদিন আর সময় না থাকায় বই পড়া হয়নি।

বাবার পুরনো আগফা ক্যামেরাটা নাড়াচাড়া করতে করতে ছবিতোলার পোকা মাথায় ঢুকল। কিন্তু  ঐ ক্যামেরাটার ফিল্ম-প্যাক সারা কলকাতা খুঁজেও পেলাম না। শেষে শিয়ালদার ‘চোরা বাজারে’ পেলাম একটা voightlander  বক্স ক্যামেরা। তখনও আগফা ক্লিক থ্রী বাজারে আসেনি। ঐ ক্যামেরাটায় কলকাতার কত ছবি যে তুলেছিলাম! সেই ক্যামেরাটা আর নেই, ছবি গুলোও কোথায় হারিয়ে গেছে। আমার এইসব শখ মেটানোর খরচ মেটাতেন আমার মা তাঁর পুঁজি থেকে।

পূজোয় নতুন জামা প্যান্ট আর বাটার জুতো পরে ঠাকুর দেখা ছাড়া আর একটা বিশেষ আকর্ষণ ছিল দেবসাহিত্যকুটিরের শারদীয়া সংখ্যা। আমাদের মধ্যে এই বইটা কে আগে হাতে পাবে সেটাই একটা বিরাট ব্যাপার ছিল। বইটা দোকানে পৌঁছোবার আগেই ওঁদের প্রেসথেকে এক কপি হস্তগত করার মজাই ছিল আলাদা।

শীতের কলকাতা মানেই ছিল বড়দিনের কেক, চিড়িয়াখানা আর সার্কাস। এবং বটানিক্যাল গার্ডেনসে পারিবারিক পিকনিক।  সবচেয়ে ভাল লেগেছিল রাশিয়ান সার্কাস। এ ছাড়াও আরও কত সার্কাস আসতো তখন – পার্কসার্কাস ময়দানে, টালাপার্কে এবং অন্যত্র। মনে পড়ে  ‘সারকারামা’র কথা। একটা বিরাট গোল তাঁবুর মতো ঘেরা জায়গায় প্রজেকশন করছিল, দর্শকরা মাঝখানে দাঁড়িয়ে। আমার শুধু মনে আছে গাড়িগুলো যেন গায়ের ওপর এসে পড়ছিল আর আমরা চেঁচিয়ে উঠছিলাম। এইরকমই এক শীতের দুপুরে বাবার সঙ্গে পোলো খেলা দেখতে গিয়েছিলাম এবং ফেরার পথে চৌরঙ্গীর কোন একটা হলে (বোধহয় টাইগার) দেখেছিলাম “The Kid”। এর মধ্যে করুণ ব্যাপারটা ছিল এই যে পরদিন ছবির কাহিনীটা – যতটুকু পারি – নিজের ভাষায় লিখতে হয়েছিল।

আমাদের বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কলকাতাও বাড়ল পাল্লা দিয়ে। আজ তো তাকে অপরিচিত মনে হয় – এত বড় বড় মল, এত গাড়ি আর মানুষের ভিড়ে মাঝে মাঝে যেন হারিয়ে যাই। তবু কলকাতাকে ভাল না বেসে পারিনা – ফিরে ফিরে আসি আর সেই স্মৃতির শহরকে ফিরে পেতে  চাই বার বার।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

Blog at WordPress.com.

Up ↑

%d bloggers like this: