খবরে প্রকাশ, পশ্চিম বাংলার বর্ধমান জেলার কোন এক গ্রামের সপ্তম শ্রেণীর ছাত্রেরা তাদের দেশ বলতে জানে বাংলাদেশ; পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশের নাম তারা জানেনা। ভারতের রাজধানীর নাম জিজ্ঞাসা করায় উত্তর দেয় – “ঢাকা”! আরও জানা জাচ্ছে যে একদম প্রাথমিক স্তরের ইংরাজিতেও এই পড়ুয়ারা এবং তাঁদের শিক্ষকগণ একেক জন ওয়েবস্টার! প্রশ্নকর্তা ছিলেন স্ময়ং জেলাশাসক।

এই খবরে অনেকে হয়তো হতাশ ও খুব্ধ হবেন। কিন্তু ভেবে দেখুন, এই শিশুরা অন্ততঃ তাদের পিতৃ-পিতামহের দেশ কে ভোলেনি। তারা ঐতিঝ্য-বিস্মৃত একথা তো বলা যাবেনা। আর ইংরাজি জ্ঞানের কথা যদি বলেন, ঐ “সাম্রাজ্যবাদী” ভাষা জানার দরকারটাই বা কি? দুশো বছর যারা আমাদের শোষণ করেছে, তাদের ভাষাকে তো আমাদের ঘেন্না করা উচিত, তাই না? তা ছাড়া, স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ বলেন নি, “শিক্ষায় মাতৃভাষাই মাতৃদুগ্ধ”? আমাদের ছাত্রেরা সেই মাতৃদুগ্ধই পান করুক, এই কি কাম্য নয়? তাই পাঠক যাই বলুন না কেন, আমি উল্লসিত হচ্ছি এই দেখে যে এই ছাত্রেরা আমাদের মান রেখেছে। ওদের এবং ওদের শিক্ষক মহাশয়দের জন্য আমাদের গর্ব বোধ করা উচিত। দেশপ্রেমের এত বড় উদাহরণ আর কি হতে পারে? নিন্দুকেরা বলবেন, মাতৃদুগ্ধ পান করে মায়ের ভাষাটা কতটা আয়ত্ত্ব হচ্ছে সেটাও প্রশ্নাতীত নয়। তা, নিন্দুকেরা অমন বলেই থাকেন। কুচুটের দল!

জেলাশাসক মহাশয়ের বিরক্ত হওয়ার কারণটা বোধগম্য হল না। সুকুমারমতি বালক বালিকাদের তিনি ঐ সমস্ত কূট প্রশ্ন করলেনই বা কেন? তার চাইতে তিনি যদি টলি বা বলিউডের নায়ক-নায়িকাদের ব্যাপারে কিছু জানতে চাইতেন, দেখতেন আমাদের ছেলেমেয়েরা কত সপ্রতিভ, এবং তাঁর মনে ঐ ছেলেমেয়েদের শিক্ষার মান সম্বন্ধে কোন সংশয় থাকতো না।

কোন কোন প্রাচীনপন্থী শিক্ষক-শিক্ষিকা প্রকাশিত খবরে খুবই চিন্তিত হবেন পশ্চিমবঙ্গে শিক্ষার মান নিয়ে। ভাববেন, যদি ভিত এত নড়বড়ে হয় এই ছাত্রেরা ভবিষ্যতে দাঁড়াবে কিসের ওপর? তাঁদের এই ভয় অমূলক। প্রথমতঃ, বাড়ি যত উঁচু হবে তার তত ভাল ভিত প্রয়োজন। যে ছেলে বা মেয়ে বড় হয়ে যা হবে তার ওপরেই নির্ভর করবে কি ধরণের শিক্ষা তার দরকার। যার সর্বোচ্চ আদর্শ তেলেভাজা অথবা মুড়ি- শিল্পপতি হওয়া, তার জন্য ভারতের রাজধানীর নাম বা ঐ রকমের কঠিন প্রশ্নের উত্তর জানা কি খুব জরুরী? তা ছাড়া, শিক্ষার মান, সাধারণ জ্ঞান এসবই আপেক্ষিক। এইতো সেদিনের খবর – আমাদের প্রতিবেশী বিহার প্রদেশের উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় প্রথম স্থান পাওয়া এক শিক্ষার্থী বলেছে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে রান্নার বিষয়ে পড়ান হয়। সে অবশ্য ইংরাজিতে বলেছিল “Prodigal Science”! এর সঙ্গে তুলনা করলে বর্ধমান জেলার ঐ ছাত্র-ছাত্রীরা তো বিদ্যাসাগর উপাধি পাওয়ার যোগ্য। আমি তো এই ভেবে পুলকিত হচ্ছি যে আমাদের শিক্ষার মান অন্ততঃ বিহারের থেকে ভালো!