আমরা যারা টেলিভিশনের পর্দায় কিংবা খবরের কাগজের পাতায় প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফরের ছবি দেখি, তারা সাধারণত তার আড়ালের বিস্তৃত প্রস্তুতি ও কর্মযজ্ঞের কথা খুব একটা ভাবি না। বিদেশ সফরের কয়েকটি আনুষ্ঠানিক মুহূর্ত—করমর্দন, যৌথ বিবৃতি, বক্তৃতা—এইসবই আমাদের চোখে ধরা পড়ে। কিন্তু এই অল্প কয়েকটি দৃশ্যের পেছনে যে কত মানুষের পরিশ্রম, কত স্তরের প্রস্তুতি, এবং কত অদৃশ্য সমন্বয় কাজ করে, তার আভাস বাইরে থেকে পাওয়া প্রায় অসম্ভব।

আর সেই সফর যদি হয় বাংলাদেশের মতো ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী দেশে, তাহলে তো কথাই নেই।

২০১৫ সালের জুন মাসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর দু’দিনের ঢাকা সফরের সূচি ঘোষণা হতেই ঢাকায় আমাদের হাইকমিশনে যেন যুদ্ধকালীন তৎপরতা শুরু হল। প্রধানমন্ত্রী পৌঁছানোর কয়েকদিন আগেই রাজশাহী ও চট্টগ্রামের সহকারী হাইকমিশনারদের তলব এল। সহকর্মী সোমনাথ হালদার চট্টগ্রাম থেকে, আর আমি রাজশাহী থেকে প্রায় একই সময়ে ঢাকায় এসে হাজির হলাম। আজ ভাবলে খারাপ লাগে—সোমনাথ আর আমাদের মধ্যে নেই।

একটি কথা এখানে বলে রাখা ভাল। কয়েক মাস অন্তর অন্তর আমাদের ঢাকায় যেতেই হত হাইকমিশনারের সঙ্গে বৈঠক করতে। সেই বৈঠকের সময়টুকু বাদ দিলে ঢাকায় আমাদের অস্থায়ী সদর দফতর হয়ে উঠত সহকর্মী সিদ্ধার্থ চট্টোপাধ্যায়ের অফিসঘর।

হাইকমিশনের ওই ঘরটির বিশেষ আকর্ষণ ছিল তার সঙ্গে লাগোয়া একটি বড় বারান্দা। সত্যি বলতে কী, সেই বারান্দাটাই ছিল আমাদের প্রধান টান।

সিদ্ধার্থ তখন দূতাবাসের সংবাদ ও তথ্যসচিব। ফলে প্রায় সারাক্ষণই তার ফোন বেজে চলেছে—কখনো সাংবাদিক, কখনো শিল্পী, কখনো সাংস্কৃতিক জগতের কেউ। কেউ ফোন করছেন, কেউ বা সরাসরি এসে হাজির হচ্ছেন। তার ফাঁকে ফাঁকেই চলছে “ভারত বিচিত্রা” পত্রিকার প্রুফ দেখা। আমরা মাঝেমধ্যে মিটিংয়ে গিয়ে বসের ধমকধামক খেয়ে আবার ফিরে এসে সেই ঘরেই বসি—চা খাই, গল্প করি, আর বারান্দায় দাঁড়িয়ে একটু হাওয়া খাই।

পদ্মাপাড়ের জেলা শহর রাজশাহীর মুক্ত বাতাস থেকে এসে অস্বাস্থ্যকর ঢাকায় কয়েকটা দিন কাটানো—এ যেন আমার উল্টো ‘হাওয়া বদল’।

কিন্তু এবারের ঢাকা যাওয়া ছিল একেবারেই আলাদা।

প্রধানমন্ত্রীর সফর নির্বিঘ্ন করতে আমাদের প্রত্যেককে কিছু না কিছু দায়িত্ব দেওয়া হল। সন্দীপ চক্রবর্তী তখন ঢাকায় ডেপুটি হাইকমিশনার। সাউথ ব্লকে তিনি আমার পুরনো বস। আমাদের প্রত্যেকের হাতে একটি করে টাইপ করা কাগজ ধরিয়ে দিলেন। তাতে প্রধানমন্ত্রীর সফরসূচি, আমাদের দায়িত্ব, কোন হোটেলে থাকব, ড্রাইভারের ফোন নম্বর—সব কিছু লেখা।

হাইকমিশনারও সংক্ষেপে দায়িত্বগুলো বুঝিয়ে দিলেন।

আমার কাজ পড়ল দু’টি জায়গায়—ঢাকেশ্বরী মন্দির এবং বঙ্গবন্ধু ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স সেন্টার। আর একটা কাজও ফাউ হিসাবে জুটেছিল। তার কথা পরে আসছে।

ঢাকেশ্বরীর দায়িত্বের তালিকা শুনে প্রথমে একটু আঁতকে উঠেছিলাম। প্রধানমন্ত্রীর প্রবেশপথ কোথায় হবে, বেরোনোর পথ কোনটা, তাঁর সঙ্গে আসা অন্যরা কোথায় দাঁড়াবেন, কোথায় জুতো খুলবেন, পুজো ও আরতির পর তিনি কীভাবে মন্দির কমিটির কিছু বাছাইকরা সদস্যদের সঙ্গে করমর্দন করবেন, কোথায় ছবি তোলা হবে, টেলিভিশনের ক্যামেরা কোথায় থাকবে—এমনকি শেষে কোন পথ দিয়ে তাঁকে গাড়ি পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হবে—সব কিছুর পরিকল্পনা করতে হবে।

এর মধ্যে আবার একটি ছোট্ট ‘বিশেষ মুহূর্ত’ও রাখা হয়েছিল—যাতে মন্দিরের একজন হিন্দি জানা কর্মকর্তা কয়েক মিনিট প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে পারেন, অথচ সেজন্য তাঁকে আলাদা করে থামতে না হয়।

সব মিলিয়ে পনেরো মিনিটের অনুষ্ঠান।

কিন্তু সেই পনেরো মিনিটকে নিখুঁত করতে যে কত খুঁটিনাটি ভেবে রাখতে হয়, তা তখনই বুঝতে পারলাম।

প্রথম বৈঠকের দিন এস পি জির অফিসার তখনও এসে পৌঁছাননি। কিন্তু মন্দির কমিটির কয়েকজনের সঙ্গে আমার আগে থেকেই আলাপ ছিল। তাঁদের এবং বাংলাদেশের এস এস এফ-এর একজন মেজরের সাহায্যে আমরা একটি প্রাথমিক পরিকল্পনা দাঁড় করিয়ে ফেললাম। দিল্লি থেকে আসা মিডিয়ার দায়িত্বে থাকা এক সহকর্মী দূরদর্শন ও অন্যান্য টেলিভিশন সাংবাদিকদের জন্য মঞ্চের জায়গাটাও নির্দিষ্ট করে দিলেন।

পরদিন এস পি জির মি. রায় এসে পৌঁছলেন। আমাদের পরিকল্পনাটি দেখে নিরাপত্তার দিক থেকে অনুমোদন দিলেন। তারপর সেটাই চূড়ান্ত রূপে হাইকমিশনে জমা পড়ল।

আমি সেই কাগজের একটি কপি নিয়ে প্রায় নাটকের সংলাপ মুখস্থ করার মতো করে গোটা ব্যাপারটা মাথায় গেঁথে নিতে লাগলাম। কারণ ঢাকেশ্বরীতে আমাকে সাহায্য করার জন্য অন্য কেউ থাকবে না।

প্রধানমন্ত্রীর আসতে তখনও দু’দিন বাকি। টেনশন কাটানোর ভরসা আবার সেই সিদ্ধার্থের বারান্দা।

সেখানে গিয়ে দেখি যেন ছোটখাটো মেলা বসেছে। ভারত থেকে আসা এক সাংবাদিকের পরিচয়পত্র তৈরি হয়নি, আরেকজন বাংলাদেশের কোনো নেতার সাক্ষাৎকার চান—তার ব্যবস্থা করতে হবে। এর মধ্যেই দেখি এক দর্জি ফিতে নিয়ে একজন কলকাতার সাংবাদিকের মাপ নিচ্ছেন—তড়িঘড়ি একটা স্যুট বানাতে হবে!

সে এক বিচিত্র অবস্থা।

সন্ধ্যায় হোটেলে ফিরে এক কাব্যিক নামের লাউঞ্জে গিয়ে বসেছিলাম। কিন্তু সেখানেও শান্তি নেই—লাইভ মিউজিকের প্রচণ্ড শব্দ। পরদিন ঢাকেশ্বরীতে রিহার্সাল, তাই তাড়াতাড়ি খেয়ে শুয়ে পড়লাম।

রিহার্সাল মোটামুটি ভালই হল। মনে হল পরিস্থিতি আপাতত “আন্ডার কন্ট্রোল”।

কনফারেন্স সেন্টারের কাজ বুঝিয়ে দিল আমাদের দ্বিতীয় সচিব জিষ্ণু। সে বলল, “কিছু না – শুধু ভিআইপিরা যেন ঠিকঠাক জায়গায় বসেন সেটা দেখলেই হবে।”

আরও জানলাম, আমাকে সাহায্য করবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় তিরিশজন ছাত্রছাত্রী।

জিষ্ণুর হাসি দেখে আমার মনে হয়েছিল কাজটা খুব সহজ হবে। পরে বুঝেছিলাম, ধারণাটা কত ভুল ছিল।

ঢাকেশ্বরী পর্ব শেষ হল একেবারে পরিকল্পনামাফিক। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আসা অভিজ্ঞ অফিসাররা ঠিক সময়ে মন্দিরের বাইরে গিয়ে নিজেদের গাড়িতে উঠলেন। পরের গন্তব্য—ঢাকার রামকৃষ্ণ মিশন—কেউ মিস করলেন না।

মন্দিরের কর্মকর্তারাও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে করমর্দন করে, ছবি তুলে এবং কয়েক মিনিট কথা বলে মহাখুশি। এস পি জির মি. রায়ের সঙ্গেও ভাল আলাপ হল।

আমি তখন ভাবছি—আজকের কাজ বুঝি শেষ।

কিন্তু সরকারি কাজে ‘শেষ’ বলে কিছু নেই।

ঢাকেশ্বরীতেই হাইকমিশনার আমাকে ডেকে বললেন—সেদিন সন্ধ্যায় ক্যান্টনমেন্টের কাছে একটি হোটেলে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ও তাঁর সঙ্গীরা উঠবেন। সহকর্মী সোমনাথ তাঁদের দেখাশোনা করবে—আমিও যেন সেখানে থাকি।

 অতএব সন্ধ্যায় সপারিষদ মুখ্যমন্ত্রী হোটেলে পৌঁছতেই আমরা তাঁদের অভ্যর্থনা জানালাম।

ডিনারের সময় মুখ্যসচিব তাড়াতাড়ি খেয়ে নিতে চাইলে আমি তাঁর সঙ্গে বসলাম। কথায় কথায় তিনি জানালেন—ঢাকার কাছেই তাঁর পৈত্রিক গ্রাম। সুযোগ পেলে একবার ঘুরে দেখতে চান।

ব্যবস্থা হয়ে গেল।

পরদিন সকাল সাতটায় তিনি সোমনাথকে নিয়ে বেরোবেন, সঙ্গে একজন স্থানীয় ভদ্রলোক এবং নিরাপত্তাকর্মীরা থাকবেন।  দশটার মধ্যে ফিরে এসে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে যোগ দেবেন। ততক্ষণ দুর্গ রক্ষার দায়িত্ব আমার।

কিন্তু দুর্গাধীশ হওয়া যে সহজ কাজ নয়, সেটা একটু পরেই বুঝলাম।

স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী আমাকে ডেকে বললেন—তিনি ঢাকেশ্বরী মন্দিরে গিয়ে পুজো দিতে চান। ব্যবস্থা করা যাবে?

সেদিন ঢাকার রাস্তায় প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচির জন্য কড়া বিধিনিষেধ ছিল। একই সময়ে দুই ভিভিআইপিকে দুই দিকে নিয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব। কিন্তু অভিজ্ঞতায় জানতাম—সরাসরি ‘না’ বলা ঠিক নয়।

মন্দিরে ফোন করলাম। তারা বলল—পুজো দেওয়া যাবে, কিন্তু ট্রাফিকের মধ্যে পৌঁছানো কঠিন। তবে মোটরসাইকেলে প্রসাদ পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা যাবে।

তারপর ফোন করলাম পরিচিত এস এস এফ মেজরকে।

তিনি খুব সংক্ষেপে বললেন—
“দ্যাটস ইম্পসিবল।”

অতএব মুখ্যমন্ত্রীকে গিয়ে পরিস্থিতি জানালাম। তিনি হেসে বললেন— তাহলে পুজো মন্দির থেকেই দিয়ে প্রসাদ এখানে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করুন। গোত্র জিজ্ঞাসা করায় বললেন—
“মা-মাটি-মানুষ।” আমি সেটাই পুরোহিতমশায়কে জানিয়ে দিলাম। তিনি কীভাবে পুজো দিলেন, তিনিই জানেন।

কিছুক্ষণ পরে দুই তরুণ প্রসাদ নিয়ে এল। মুখ্যমন্ত্রী তাঁদের চা খাইয়ে বিদায় করলেন।

তারপর সবাই ঠিক সময়েই বঙ্গভবনের অনুষ্ঠানে গেলেন।

আর আমি গেলাম কনফারেন্স সেন্টারে — যেখানে আমার জন্য অপেক্ষা করছিল আরেকটি ছোটখাটো যুদ্ধ।

সভা শুরুর আগেই হল ভরে উঠতে শুরু করল। সামনে নাম লেখা আসন ছিল, কিন্তু তার পিছনের সারিগুলো নিয়ে হুলুস্থুল। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের সেই চেয়ারগুলোতে বসিয়ে দিয়েছিলাম—আমার ইশারা ছাড়া তারা উঠবে না। এদিকে, সবাই নিজেকে “বড় নেতা” বলে দাবি করছেন। এমনকি প্রবীণ নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে আসন দেওয়ার জন্য আমাকে হস্তক্ষেপ করতে হল।

আমি কী মনে করে প্রথম সারিতে দু’টি চেয়ারে “Reserved” লিখে রেখেছিলাম। সেই দুটি চেয়ারই শেষে আমাকে বাঁচাল।

প্রথমটি দিতে হল প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি জেনারেল এরশাদকে। এদিকে, সভা শুরু হওয়ার দু’ মিনিট আগে ঢুকে পড়লেন বেগম রওশন এরশাদ।  তখন তাঁদের পারস্পরিক সম্পর্ক মোটেই মধুর ছিল না। তবু, বাধ্য হয়ে, দুজনকে পাশাপাশি বসাতে হল। তাঁরাও একে অপরকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে বসে রইলেন।

এই দৃশ্য দেখে প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে হলে ঢোকার সময় হাইকমিশনার আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসতে ভোলেননি।

আমি লক্ষ্য করলাম—অনেকেই অনুবাদের হেডফোন খুলে রেখে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর হিন্দি ভাষণ শুনছেন আর মাঝে মাঝেই সম্মতিসূচক মাথা নাড়ছেন।

ভাষণ শেষে যখন গোটা হল দাঁড়িয়ে উঠে হাততালি দিল, তখন বুঝলাম বক্তৃতাটি আবেগপ্রবণ বাঙালির হৃদয় স্পর্শ করেছে। সে আবেগ অবশ্য দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। তবু অন্তত এক বছর তার রেশ ছিল।

আর সেই সময়ের মধ্যেই দীর্ঘ সাতান্ন বছর ধরে ঝুলে থাকা ভারত–বাংলাদেশ ছিটমহল সমস্যার সমাধান হয়েছিল।

সে গল্প অন্যদিন।