আমরা যারা বিভূতিভূষণ, শরদিন্দু গল্প উপন্যাস পড়েছি, এবং বিশেষ করে প্রেমেন্দ্র মিত্রের ঘনাদাকে চিনি, তারা কলকাতার মেস নামক প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে কিছুটা পরিচিত। অনেক পুরনো চলচ্চিত্রেও মেসের চমৎকার ছবি পাওয়া যায়। ক্ষয়ে যাওয়া, দাঁত বেরকরা ইটের প্রায় ভেঙে পড়া একটা বাড়ি, মাঝখানে উঠোন আর জলের কল। সেইখানে ভোর হতে না হতেই ম্যানেজারের চেঁচামিচি, ঝিয়ের চিৎকার, শতচ্ছিন্ন গেঞ্জীগায়ে হাড়-জিরজিরে অফিসবাবুদের ঝড়ের বেগে দন্তমর্জন – রীতিমতো এক মহাভারত।
আজ থেকে দু’তিন দশক আগে রাজধানী দিল্লিতেও অনেক মেস ছিল। তারা ছিল নবাগত সরকারি চাকুরেদের বড়ই ভরসার স্থল। তবে, দিল্লির মেসের সঙ্গে কলকাতার মেসের একটা বড় পার্থক্য ছিল। প্রথমত, কলকাতার মেসবাড়ির মতো বিনোদন এখানে ছিলনা। দ্বিতীয়ত, কলকাতার মেসগুলোতে সাধারণতঃ একজন মালিক বা ম্যানেজার থাকতেন। মেসের সব কাজকর্ম, দেখাশোনার ভার তাঁর। মেসের মেম্বাররা মাসের প্রথমে বরাদ্দ টাকাটুকু দিয়েই খালাস। সকালের চা থেকে রাতের খাবার পর্যন্ত আর চিন্তা নেই। যেন দীর্ঘ সময় থাকার ফুল-বোর্ড হোটেল। মালিকের গ্রাসাচ্ছাদন চলত এই মেসের আয় থেকেই।
দিল্লিতেও কিছু এরকম মেস ছিল, হয়তো এখনও আছে। তবে এখানে বেশিরভাগই ছিল শুধু খাওয়ার মেস; থাকার ব্যবস্থা নিজস্ব। সরকারি ‘কলোনি’ অর্থাৎ কর্মচারিদের কোয়ার্টারগুলোর আশেপাশেই গড়ে উঠত এই মেসগুলো। বে-আইনি হলেও, কোয়ার্টারের মালিকরা তাঁদের একটা ঘর ভাড়া দিতেন দিল্লির বাইরে থেকে আসা চাকুরেদের। আর সেইসব “কিরায়াদার” ছোকরারা কাছাকাছি কোথাও একটা ঘর ভাড়া করে দু’বেলা রান্নার লোক রেখে গড়ে তুলত ‘মেস’। এখানে কোন লাভ লোকসানের ব্যাপার ছিলনা। যা খরচ হত সকলের মধ্যে ভাগ হয়ে যেত। যাক গে, এখন দিল্লিতে আমার প্রথম অভিজ্ঞতার কথা বলি।
দিল্লিতে আমার কোন আত্মীয় বা বন্ধুবান্ধব ছিল না। শুধু জানতাম নিউ দিল্লি কালীবাড়ির অতিথিশালায় থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা আছে, এবং জায়গাটা নিউ দিল্লি স্টেশনের কাছেই – অটোকে দশ টাকা দিলেই পৌঁছে দেবে। বিকল্প হিসেবে করোলবাগ বঙ্গীয় সমাজের কোন এক কর্তার নামেও একটা চিঠি ছিল সঙ্গে।
এই দুই বাঙালি প্রতিষ্ঠানের অনিশ্চিত ভরসায় পঁয়তাল্লিশ বছর আগে এপ্রিল মাসের প্রচন্ড গরমের মধ্যে একটা স্যুটকেশ আর ছোট একটা ব্যাগ নিয়ে তখনকার ডি লাক্স ট্রেণ থেকে নেমে কীভাবে অটো রিক্সা নিয়ে কালীবাড়ি পৌঁছেছিলাম মনে নেই। তবে সেদিন ছিল রবিবার, এবং ফাঁকা রাস্তাদিয়ে মিনিট দশেকের মধ্যেই কালীবাড়ি পৌঁছে গিয়েছিলাম।
কালীবাড়ির অফিসে যিনি বসেছিলেন তাঁর গম্ভীর মুখ দেখে ভরসা না পেলেও ঘর পেতে সমস্যা হল না, যদিও বেশ বুঝলাম আমার বয়স, চেহারা আর সঙ্গের জিনিসপত্র দেখে আমার ‘ট্যুরিস্ট’ পরিচয় তাঁকে মোটেই বোকা বানাতে পারেনি। তবে মুখে কিছু না বলে চার দিনের জন্য ওখানকার ডর্মিটরিতে থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন। খরচ – হাসবেন না – তিনবেলার খাওয়া সহ দশ টাকা প্রতি দিন। আর, চারজনের রুমে আমি একমেবাদ্বিতীয়ম। বাথরুম অ্যাটাচড না হলেও, একা আমার জন্যে তিনটে! সোজা কথায়, দিল্লির ওই গরমের মধ্যে নেহাতই দায় না ঠেকলে কেউ আসে না। তাই কালীবাড়ির ধর্মশালা একদম ফাঁকা।
অস্থায়ী হলেও এত সহজে থাকার ব্যবস্থা হয়ে যাবে ভাবিনি, তাই মহানন্দে মা কালীকে একটা প্রণাম ঠুকে পরদিন সাউথ ব্লক কীভাবে যাওয়া যায় সে সম্বন্ধে খোঁজ নিলাম। জানা গেল কালীবাড়ির উল্টো দিক থেকে বাস পাওয়া যাবে, অথবা অটো।
তখন কি ছাই জানি এখানে সেক্রেটারিয়েটকে বলে ‘দফতর’! কন্ডাক্টর তাই বলেই লোক ডাকছিল, কিন্তু আমার ভরসা হল না। কোথায় যেতে কোথায় চলে যাবো এই ভেবে একটা অটো নেওয়াই নিরাপদ মনে হল।
কিন্তু আমার কলকাত্তাই গুমোর ভেঙে দিয়ে সেই অটো চালক দশ মিনিটের রাস্তা পঁচিশ মিনিট লাগিয়ে একটা হাসপাতাল, গোটা দুয়েক গুরুদ্বারা আর এ ভবন সে ভবন দেখিয়ে বুঝিয়ে দিল সাউথ ব্লক কত…দূর! তাও যদি সাউথব্লকের গেটে ছাড়ত। একজন সহৃদয় মানুষ – সরকারি কর্মচারিই হবেন – আমাকে ওই বিশাল খিলানের নিচদিয়ে ঢুকে অন্য দরজা দিয়ে বেরিয়ে উল্টোদিকের অফিসে, সেটাই সাউথ ব্লক, যেতে বললেন। সে সময়ে নর্থ ব্লকের সেন্ট্রাল হলে ঢুকতে কোন পরিচয়পত্র লাগত না। খাকি পোষাকের, অস্ত্রবিহীন, সেক্রেটারিয়েট সিক্যুরিটি ফোর্সের লোক অলস ভাবে দাঁড়িয়ে থাকত। তবে সাউথ ব্লকের চার নম্বর গেটে দেখলাম একটু চেক হচ্ছে।
রিসেপশনের গেরো কাটিয়ে হাতে একটা ডিউটি পাস লেখা কাগজ নিয়ে চললাম জয়েন করতে। ভাগ্য ভাল যে রিসেপশনিস্ট ভদ্রলোক বলেন নি পুরো সাউথ ব্লক ঘুরে বাইরে দিয়ে যেতে, কারণ তখন আমাদের প্রশাসনিক অফিসগুলো ছিল সাউথ ব্লকের পিছনে – যেখানে এখন প্রধানমন্ত্রীর দফতরের গাড়ি রাখার জায়গা না অন্যকিছু, সেইখানে।
খিলান দেওয়া লম্বা বারান্দা পার হয়ে চললাম পিছনের গেটে… একদিকে সারি সারি বন্ধ দরজা আর অন্যদিকে ঝুলছে ভিজে খসখস। মাঝে মাঝে ডাইনে বাঁয়ে পথ গিয়েছে কত। কিন্তু আমাকে বলে দিয়েছিল সোজা যেতে। তাই গোলকধাঁধায় ঘুরতে হয়নি। যাই হোক, সেই বারান্দা পার হয়ে সাউথ ব্লকের বাইরে হাটমেন্ট-এ পৌঁছলাম। নির্দিষ্ট ঘরে ঢুকে দেখি আমারই মতো কয়েকজন অপেক্ষা করছে। দুজনের সঙ্গে আলাপও হল। একজন পাঞ্জাবি, আর অন্যজন কন্নড়। আমাদের পাঁচ জনের গ্রুপ। একজন বাঙালি ছিল, কিন্তু সে সেদিন জয়েন করেনি। পরে সেই পাঁচ জনের ব্যাচ কি ভাবে যেন তের জনের হয়ে গিয়েছিল। সেসব ঘোরপ্যাঁচ তখনও শিখিনি।
কিছু কাগজপত্রে সই করতে হল। প্রায় অন্ধের মতো সেসব করলাম। কয়েকটা ছবিও জমা দিলাম – পরিচয়পত্র তৈরি হবে। সেই পরিচয়পত্র ছিল ভীষণ কাজের। তার বলেই প্রায় সব সরকারি ভবনে প্রবেশাধিকার পেয়েছিলাম। কিন্তু একটা টাইপকরা কাগজে সই করতে গিয়ে থমকে গেলাম। আমায় বলতে হবে যে আমি সরকারি গোপনীয়তা রক্ষা আইনটি পড়েছি, এবং বুঝেছি। উকিলের রক্ত শিরায় বইছে। অত সহজে কী সই করা যায়! সবিনয়ে বললাম আমি আইনটা পড়তে চাই সই করার আগে।
অফিসার মানুষটি রসিক। বললেন – ছেলে, চাকরি করতে চাও, না আইনটা পড়তে চাও? যদি জয়েন করার ইচ্ছে থাকে সই করো, আর যদি আইনটা পড়তে চাও তবে বসো। লাইব্রেরীতে লোক পাঠাই, বইটা আসুক, তারপরে পড়েটড়ে সই কোরো ধীরে সুস্থে। সে আজকে নাও হতে পারে। সুড়সুড় করে সই করে দিলাম। এই আইনটা বহু বছর পরে আমাকে অনেকবার পড়তে হয়েছিল কাজের সুবাদে। বড় ভয়ানক আইন।
হাতে একটা কাগজ পেলাম। শাস্ত্রী ভবন নামে কোথাও কোন একটা অফিসে আমাকে যেতে হবে। শাস্ত্রী ভবন? সেটা আবার কোথায়? আমার নবলব্ধ দুই বন্ধু আমাকে উদ্ধার করল। ওরা আগে অন্য অফিসে কাজ করত, দিল্লির সব অফিস ওদের চেনা। কিন্তু শাস্ত্রী ভবনে যাওয়ার আগে আমার কন্নড় বন্ধুটি এমন একটা উপকার করেছিল যে আমি আজও তার ঋণ স্বীকার করি। সে আমাকে নর্থ ব্লকে নিয়ে গিয়ে দুই বাঙালি ছেলের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিল। এই পরিচয়টা না হলে আমার দিল্লি-প্রবাসের গল্পটা হয়ত অন্যরকম হত।
গুটিগুটি শাস্ত্রীভবনের দোতলায় পৌঁছলাম। কার্পেট বিছানো করিডরের দু’ধারে সারি সারি বন্ধ দরজা। লক্ষ্য করলাম দু’ধরণের নেমপ্লেট – কোনটা পালিশ করা কাঠের উপর সাদা রঙে লেখা, আগার কোনটা পিতলের চকচকে অক্ষর বসানো। ভাষা – হিন্দি এবং ইংরিজি। নেমপ্লেটের জাতিভেদ প্রথার অন্দিসন্ধি অনেক পরে জেনেছিলাম ।
আমার কাগজে লেখা নাম আর রুমনম্বর দেখে নির্দিষ্ট দরজা ঠেলে ঢুকলাম। আমার সম্ভাব্য আগমন বার্তা বোধ হয় ‘প্রশাসন’ থেকে আগেই পৌঁছে গিয়েছিল। কিন্তু কেন জানি না, সেই প্রথম চাকরির দিন থেকে দেখছি একবার দেখে কারোরই পছন্দ হয় না। এবারও তাই হল। যে শিখ ভদ্রলোকের হাতে কাগজটা দিয়েছিলাম, তিনি আমায় অপাঙ্গে দেখেই একটা বিস্কুট রঙের ফোনের ডায়াল ঘোরালেন এবং মনে হল ইংরিজি ও পাঞ্জাবি মিশিয়ে লাইনের ওদিকে কাউকে আমাকে তাঁর নাপসন্দ হওয়ার কথা বলছেন। কিছুক্ষণ পরে হাল ছেড়ে দিলেন এবং বসতে বললেন। দিল্লিতে আমার অফিস করা শুরু হল। প্রথমে বসের সঙ্গে পরিচয়। সিনিয়র মানুষ, একটু গোমড়ামুখ বললে ভুল হবে না। কিন্তু ওঁর কাছে কাজ করতে কোন অসুবিধে হয় নি।
অফিসটা মন্দ ছিল না। বুঝতে পারলাম শিখ ভদ্রলোক প্রথমে আমাকে নামঞ্জুর করেছিলেন কারণ তিনি আমাদের বিগ বসের জন্য কোন অভিজ্ঞ কাউকে চেয়েছিলেন। দুর্ভাগ্য যে ইউ পি এস সি থেকে আমরা, বাচ্চারাই এসেছিলাম এবং কিছুটা বাধ্য হয়েই আমাকে নিতে হয়েছিল। তবে প্রথম সাক্ষাতে বাতিল হওয়া এবং পরে মেনে নেওয়া আমার ক্ষেত্রে প্রায় স্বাভাবিক ছিল তাই আমি কিছু মনে করিনি, আর দুদিন পরে উনিও ভুলে গিয়েছিলেন। ক্রমে বাকিদের সঙ্গেও পরিচয় হল। কয়েকজন বাঙালি অফিসারও ছিলেন।
অফিস তো চলছে, এদিকে চার দিনের জায়গায় সাত দিন কালীবাড়িতে থাকা হয়ে গেছে। নর্থ ব্লকের বাঙালি বন্ধুরা খুব শীগগিরই ব্যবস্থা হয়ে যাওয়ার ফাটা রেকর্ড বাজিয়েই চলেছে আর আমি সন্ধ্যেবেলায় প্রায় সকলের অলক্ষ্যে সুড়ুৎ করে ধর্মশালায় ঢুকে পড়ছি। এমনকি খবরের কাগজ পড়ার জন্যও ওদিক মাড়াই না। কিন্ত একদিন ধরা পড়ে গেলাম সেই গম্ভীর মুখের ভদ্রলোকের কাছে। জাবদা খাতায় আমার প্রথম প্রবেশের তারিখটা দেখেই উনি হুকুম জারি করলেন – কাল এখানে তোমার শেষ দিন; পরশু সিট খালি করে দেবে। আগে শুনেছিলাম উনি কালীবাড়ির সচিব, পদাধিকারে ক্ষমতাবান। অনুনয় বিনয় করা কোনকালেই ধাতে নেই, তাই চুপচাপ ঘাড় নেড়ে চলে এলাম।
আশ্চর্যজনক ভাবে আমার সমস্যা মিটে গেল – কোথাও যেতে হল না। ওই সচিব সাহেবই আদর করে শিকেয় তুলে রাখলেন আমায় চারটি দিন। মে দিবসের শুভ দিনে নিজেই কালীবাড়ি ছেড়ে লোদী কলোনীতে চলে গেলাম। কিন্তু চিঁড়ে ভিজল কোন গঙ্গাজলে সেটা বলছি।
বাড়ি ছাড়ার নোটিশ পাওয়া ছাপোষা ভাড়াটের মতো মুখ করে অফিসে গিয়ে শুনলাম আমাদের বস সেদিন ছুটিতে আছেন। আর, এক সিনিয়র সহকর্মী মিঃ মন্ডল আমায় স্মরণ করেছেন। আমার জানা ছিলনা যে আমার একটা থাকার ব্যবস্থা নিয়ে অনেকেই চেষ্টা করেছেন, কিন্তু তখন পর্যন্ত কিছু করে উঠতে পারেন নি। মিঃ মন্ডলের কাছে গিয়ে বসতেই উনি বললেন – ব্যবস্থা হল? আমার করুণ কাহিনী শুনে কিন্তু উনি হাসলেন, আর একটা কাগজে একটা চিঠি লিখে দিলেন ওখানকার সচিবের নামে।
সেদিন সন্ধ্যেবেলা সচিব মশাই যথারীতি আমার দিকে কটমট করে তাকাচ্ছেন। বোধহয় একজন দেশোয়ালি ভাইকে বিপদে ফেলে ভিতরে ভিতরে মজা পাচ্ছিলেন। আমি ভয়ে ভয়ে চিঠিটা ওঁকে দিলাম। চিঠিতে কি লেখাছিল আমি জানতাম না, কিন্তু দেখলাম চিঠি পড়ে ওঁর মুখের ভাবই বদলে গেল। বললেন, দেখ আমাদের তো একটা নিয়ম মানতে হয়। তবে অমুক যখন বলেছে, তুমি যতদিন দরকার এখানে থাকতে পারো। তারপরে প্রায় আধঘন্টা আমার সঙ্গে গল্প করলেন। দেখলাম ওঁর আপাতগাম্ভীর্যের আড়ালে রয়েছে একজন নিপাট ভদ্রলোক। দুঃখের কথা, ওঁর নামটা আর মনে নেই।
এর দিন দুয়েকের মধ্যেই খবর এলো যে আমার থাকার ব্যবস্থা হয়ে গেছে। আমি লোদী কলোনীর “জলি মেস ১”-এর সদশ্য হয়েছি। সেই সন্ধ্যেতেই লোটাকম্বল বেঁধে পূর্বপরিচিত মুখার্জীর সঙ্গে লোদী কলোনীর একটা ছাদের ঘরে – শুনলাম তাকে বলে বর্ষাতি – গিয়ে উঠলাম। সামনে বিরাট ছাদ আর ঘরটা বেজায় গরম। ভরসা এই যে মাসখানেকের মধ্যেই অন্য একটা “সিট” খালি হবে অন্য একটা ব্লকে আর সেখানেই আমার ব্যবস্থা হবে। বর্ষাতিটা আমার ছিল, যাকে সরকারি ভাষায় বলে ট্রানজিট অ্যাকমোডেশন।
দিল্লির পুরনো কোয়ার্টারস গুলোতে এখনও এই ‘বর্ষাতি’ ব্যাপারটা আছে। এগুলো আসলে আমাদের চিলেকোঠার ঘরেরই রাজ(ধানী) সংস্করণ। দিব্যি বড় – একজন তো বটেই, দুজনও অনায়াসে থাকতে পারে। উপরের কোয়ার্টারটা যাঁর বর্ষাতিও তাঁর। গরমের দুপুরে অবশ্য প্রাণ যায় – ওয়াটার কুলার, ডেসার্ট কুলার ইত্যাদি কোন কাজেই দেয় না। আসলে জলই তো সেই সাত সকালে একবার দেখাদিয়ে পুরো চব্বিশ ঘন্টার জন্য গায়েব হয়ে যান। তবে, সন্ধ্যের পর এবং রাতে ছাতটা খুবই কাজের। খাটিয়াটা টেনে এনে খোলা আকাশের নিচে দিব্যি ঘুম হয়। বর্ষাতিতে থাকার একটা বিশেষ সুবিধে ছিল। কোনরকম বাইরের গোলমাল সহজে না পৌঁছানোর ফলে পড়াশোনা বা আড্ডা মারা দুটোরই আদর্শ জায়গা ছিল বর্ষাতি।
তার মধ্যে কিন্তু সতর্ক থাকতে হয় কারণ “মালিক মকান” (নাকি মকান মালিক, আজও জানিনা কোনটা ঠিক) সপরিবারে ছাতেই শোবেন – তাঁর আবার কন্যারা আছে। তাদের দিকে “কিরায়াদার” ছোকরারা যেন আড়চোখেও নজর না দেয় সে ব্যাপারে তাঁর সতর্ক দৃষ্টি। অবশ্য দুএকটা মধুর ঘটনা যে ঘটে না, তা নয়। তবে বেশিরভাগই গোপনে বিরহডোরে বাঁধিব… ধরণের মানসিক ব্যাধি!
এতো গেল ভালর দিক। কিন্তু বর্ষাতিতে থাকার একটা দারুণ, অনেকের জন্য প্রায় প্রাণঘাতি অসুবিধে ছিল এই যে ছাতে কোন স্নানঘর থাকেনা। সকালে, নির্দিষ্ট সময়ে নিচে বাড়িওয়ালারটি ব্যবহার করার অনুমতি থাকে; অন্যসময় নো এন্ট্রি। এ সমস্যা সমাধানের “বহুত সারে ব্যবস্থায়ে” আছে। বুঝ লোক যে জান সন্ধান। ‘স্নান’ কিন্তু সারতে হবে ছাতের কলেই। শীতগ্রীষ্মে একই ব্যবস্থা।
যাইহোক, কিছুদিনের মধ্যেই অন্য এক ব্লকের একতলায় একজনের রুম-মেট চলে যাওয়ায় আমার পদাবনতি হল, এবং এর পরে যতদিন দিল্লিতে ছিলাম, “চক্রবর্তী”ই ছিলেন আমার ফ্রেন্ড, ফিলসফার এবং গাইড। মাঝে একবার বাসস্থান বদলাতে হয়। আমরা চলে যাই চ্যামেরি (এরও মানে জানিনা) কোয়ার্টারের দোতলায় এক সজ্জন শর্মাজির আশ্রয়ে। এখানে কোন সমস্যা তো ছিলই না, বরং আমাদের অনেক সুবিধে হয়েছিল। আর, যেদিন দেখলাম যে দড়ির খাটিয়ায় শুয়ে একে অপরকে দেখতে পাচ্ছিনা, সেদিনই কোটলা-মোবারকপুর থেকে দুজনে দুটো জবরদস্ত তক্তাপোষ কিনে এনেছিলাম।
মেসের কথা দুএকটা বলা যাক। আমাদের মেসে ৩৫ জন সদস্য ছিল। একজন রান্নার লোক ও আর একজন তার সহায়ক। এরা মেসেই থাকত। রান্নার লোকটি (যতদূর মনে আছে, তার নাম ছিল জয়করণ) সম্ভবত উত্তর প্রদেশের লোক আর রামু ছিল পাহাড়ি ছেলে। প্রতিমাসে আমাদের মধ্য থেকে একজন ম্যানেজার হত আর অন্যরা তাকে মাসের খরচের টাকাটা অগ্রিম দিয়ে দিত। মাসের শেষে ম্যানেজার হিসাব করে সামান্য যেটুকু বেশি লাগত সেটা সকলের থেকে নিয়ে নিত। কিছু বাঁচলে (সত্যিই বাঁচত কখনও সখনও, কোন মাসে “অতিথি” বেশি থাকলে) সেটা পরের মাসের তহবিলে যোগ হত। সেই সত্যযুগে মাসে ১২০ টাকার বেশি মেস চার্জ হলে ম্যানেজারকে রীতিমটো পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটির কাছে জবাবদিহি করতে হত।
বাজার প্রত্যেককে করতে হত প্রতিদিন সন্ধ্যে বেলায়। তার একটা তালিকা ছিল। কেউ নির্দিষ্ট দিনে অপারগ হলে অন্য কারো সঙ্গে বদলে নিত। মেসে শুধু ছিল দুবেলার খাওয়ার ব্যবস্থা – জলখাবার ইত্যাদি নিজেদের ব্যবস্থা করতে হত। প্রতিদিন ডাল, ভাত, তরকারি এবং মাছ। সপ্তাহে একদিন পাঁঠার মাংস এবং মাঝে একদিন ডিম। মাসে একদিন মেস বন্ধ, আর শেষ রবিবারে “গ্র্যান্ড ফিস্ট”। মেসের কাছেই গোড়ারামের মাছের দোকান থেকে মাছ আসত, কোন অভিযোগ ছিলনা তার মান নিয়ে। কিন্তু মাছের সাইজ নিয়ে কোন কম্প্রমাইজ কেউ সহ্য করত না। ধুন্ধুমার লেগে যেত। তরকারি এবং মাছ একবারই পাওয়া গেলেও, ডাল-ভাত খাওয়ার কোন সীমা ছিল না। আর আমরা খেতামও বটে! একদিন আমাদের কুক কাম ডায়েটিশিয়ান জয়করণ উপদেশ দিল, “জ্যাদা মত খায়া করো, বিমার পড় জাওগে”!
আমাদের মেসের প্রাণপুরুষ সিনহাদা, ওরফে ক্যাপ্টেন সিনহার কথা না বললেই নয়। এই আধা ব্যাচেলর মানুষটি ছিলেন কমার্শিয়াল পাইলট। কিন্তু কোন কারণে তাঁর লাইসেন্সটি বাতিল হয়ে যায়। ওঁর স্ত্রী সম্ভবত ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সে কাজ করতেন। সিনহাদা দিল্লিতেই একটা বর্ষাতিতে থাকতেন। কিন্তু সে আমাদের মতো ব্যাপার নয়। ওঁর বর্ষাতিতে লাগোয়া বাথরুম ছিল এবং ঘরটা ছাদে না হলে অনায়াসে কোন বড়মানুষের বসার ঘর বলা চলতো। সাইকেলে চেপে ঘুরতেন, কিন্তু চালচলনে একটা অনায়াস- আভিজাত্য। কি যে কাজ করতেন কেউ জানত না, কিন্তু বেশ স্বচ্ছল জীবন যাত্রা, আর উপর মহলে ওঁর ভাল রকম চেনাশোনা ছিল এটা সত্যি।
ওঁর আভিজাত্যের উৎস অবশ্য পরে জানতে পেরেছিলাম। একবার কলকাতায় যাবো, সিনহাদা আমাকে কিছু জিনিস দিয়ে অনুরোধ করলেন ওঁর কলকাতার বাড়িতে পৌঁছে দিতে। দক্ষিণ কলকাতার এক বনেদি পাড়ার যে বাংলো বাড়িটায় গিয়ে জিনিসগুলো দিয়ে এসেছিলাম তার গেটের বাইরে যে নাম-ফলক ছিল, সে পরিবারের নাম কলকাতার সবারই জানা। দিল্লি ফেরার পরে যখন সিনহাদাকে বললাম, উনি শুধু মুচকি হেসে ব্যাপারটা এড়িয়ে গেলেন।
এহেন সিনহাদা কিন্তু ছিলেন মেস অন্ত প্রাণ। মেস কীকরে আরও ভালভাবে চলবে, খাওদাওয়ার মান বাড়িয়ে কম খরচে কীভাবে চালানো যায় এসব নিয়ে মেসের “জেনারাল মিটিঙে” সিনহাদা নানা রকম প্রস্তাব রাখতেন। কেউ কেউ আড়ালে হাসাহাসি করলেও সিনহাদার আন্তরিকতায় কোন খাদ ছিলনা। আমাদের মেসের নোটিশ বোর্ডে রোজই উনি নিত্যনতুন নোটিশ লাগাতেন। রাত দুপুরে একবার আমাদের ঘুম ভাঙ্গিয়ে বললেন জয়করণ মেসের রান্না ভাত নাকি বিক্রি করে দিচ্ছে, উনি দেখেছেন।
সিনহা দা ছাড়াও আমাদের মেসে আরও দুজন বয়স্ক সদস্য ছিলেন – মণি দা, যিনি জার্মান ডেমক্রাটিক রিপাব্লিকের দূতাবাসে কাজ করতেন, আর একজন ছিলেন মিত্তির দা। তিনি ডি টু টাইপ কোয়ার্টারে একা থাকতেন। তাঁর কর্মস্থল জানতাম না।
মেসে সন্ধ্যেবেলা আনন্দবাজার পত্রিকা নিয়ে আমাদের আসর বসত, ঠিক কলকাতার রকের আড্ডার মতো।
একবার মণিদার মেয়ে কোন কারণে দিল্লি আসে বাবার কাছে। সন্ধ্যেবেলা যথারীতি আনন্দবাজার টুকরো টুকরো হয়ে হাতে হাতে ঘুরছে, আর বাংলার রাজনীতির চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে, এমন সময় মণিদা তাঁর সুন্দরী মেয়েকে নিয়ে রাতের খাবার খেতে এলেন। জলি মেসে এরকম ঘটনা অভূতপূর্ব। ব্যানার্জি, মুখার্জি, সরকার, ভটচাজ কে কি করবে ভেবে পাচ্ছেনা। কারো হাতে উল্টো খবরের কাগজ, আর কেউ হঠাৎ ভিতরে ঢুকে খামোখাই জয়করণের সঙ্গে সে রাতের ডিনারে নতুন কিছু আছে কী না সেই খবর নিতে ব্যস্ত। শুনেছি, এমনকি সিনহাদাও নাকি ঘাবড়ে গিয়ে একটা পুরনো নোটিশ নতুন করে লাগাতে মন দিয়েছিলেন।
আমাদেরই মধ্যে একজন এই ঘটনাটাকে একটু রং চং দিয়ে একটা নাটিকা লিখে ফেললেন। সিনহাদাকে বললাম নাটকটা মঞ্চস্থ করতে হবে। উনিই উদ্যোগী হয়ে লোদি কলোনীর কমিউনিটি হলটা বুক করে ফেললেন এবং ওখানকার সব বাঙালিদের নেমন্তন্ন করে দিলেন। যে ঘটনার উপর ভিত্তি করে নাটক তার আসল চরিত্ররাই নিজের নিজের পার্ট করবে, তাই মহড়ার বিশেষ প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু প্রধান চরিত্র, মানে নায়িকা কোথায়?
শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নির্দেশক “ও হয়ে যাবে” বলে চালিয়ে দিলেন। এমনকি সিনহাদাও কোন পরিবারকে রাজি করাতে পারলেন না কয়েক মিনিটের জন্য তাঁদের একটি মেয়েকে স্টেজের “মেসে” আবির্ভূত হয়ে হাসিমুখে সবাইকে “নমস্কার” বলতে। হ্যাঁ। এটুকুই ছিল “নায়িকার আবির্ভাব” নাটিকায় নায়িকার অভিনয়। বাকিটা মেসের দৈনন্দিন চিত্র, সান্ধ্য আড্ডার ঝলক, আর সিনহাদার নোটিশ টাঙানো, এই সব নিয়ে হাল্কা হাসির গল্প। নায়িকার আগমন একেবারে শেষে। কিন্তু সেই ভাইটাল রোল কে করবেন সেটা নাটক শুরুর পনেরো মিনিট আগে পর্যন্ত কারো জানা ছিল না।
যে সময়ের কথা বলছি, তখন নিউ দিল্লিকে “বাবু শহর” বলা হোত, কারণ শহরের বেশিরভাব অধিবাসিই ছিলেন সরকারি কর্মচারি। সন্ধ্যে সাতটা বাজতে না বাজতে চারিদিক নিঃঝুম হয়ে যেত – ঘরে ঘরে দূরদর্শনের সামনে বসে পুরো পরিবার চিত্রহার, ইত্যাদি দেখত। ভেবেছিলাম আমাদের পাগলামো দেখতে আদৌ কেউ আসবে কী না। কিন্তু দর্শকের সংখ্যা আমাদের অবাক করেছিল। আসলে, বাড়ি-অফিস-বাড়ির একঘেয়ে জীবনে একটু অন্যরকম কিছু হবে – এটাই বোধহয় শনিবারের সন্ধ্যায় শ’খানেক বাঙালির একত্র হওয়ার কারণ ছিল ।
মঞ্চটা সুন্দর সাজানো হয়েছিল। একাঙ্ক নাটিকা, কাজেই পর্দা ফেলা সরানোর ঝঞ্ঝাট ছিলনা। সবাই তৈরি আমাদের কান্ডকারখানা দেখতে। তখন সিনহাদার মনে পড়ল নায়িকার কথা, বা নায়িকার অভাবের কথা। লোদী কলোনীর কয়েকটি বাঙালি পরিবারের সঙ্গে মৌখিক আলাপ ছিল। তাঁদেরই একটিকে দেখিয়ে ক্যাপ্টেন সিনহা আদেশ করলেন – তুমি ভদ্রলোক কে বুঝিয়ে বল সবটা, উনি নিশ্চয় ওঁর মেয়েকে একবার স্টেজে উঠতে দিতে রাজি হবেন।
সিনহাদা ক্যাপ্টেন, আমি সামান্য কেবিন কর্মচারি । আদেশ শিরোধার্য করে, ভিতরে ভিতরে থাপ্পড় খাবার জন্য প্রস্তুত হয়ে, বিনয়ের পান্তুয়া হয়ে পরিবারটির কর্তার কাছে প্রায় কন্যার পাণি-প্রার্থীর মতো আমার আর্জি পেশ করলাম। অনুষ্ঠান শুরুর নির্ধারিত সময়ের তখন মিনিট সাতেক বাকি। নাঃ। উনি সিনেমায় দেখা গাউনপরা, পাইপমুখো “মেয়ের বাবা”র মতো আমাকে অর্ধচন্দ্র দেননি। রসিক মানুষ, আমাদের অবস্থা বুঝতে পেরেছিলেন; আর মেয়েটিও বেশ সপ্রতিভ ভাবে “আমাকে কি করতে হবে”? বলে এগিয়ে এসেছিল। তারপর আর কি? সদ্যলব্ধ নায়িকাকে আমি বিজয়গর্বে উইংসের পিছনে দাঁড় করিয়ে দিলাম।
নাটক যথা সময়ে শুরু হল, এবং মুখে হাসির ফুলঝুরি ঝরিয়ে আমাদের নায়িকা আবির্ভূত হয়ে যখন একদল গোবেচারা ব্যাচেলরকে নকআউট করে দিল, তখন হাততালিতে হল ভরে গিয়েছিল ঠিকই তবে সে ‘ঘরের মেয়েকে’ নাটকে দেখে, না আমাদের অভিনয়ের জন্য তা নিয়ে আজও আমার ঘোরতর সন্দেহ আছে।