করোনার ভয়াবহ দ্বিতীয় জোয়ার ভাটার দিকে, আমাদের দুটো করে টীকা নেওয়া হয়ে গেছে, আর সবচেয়ে বড় কথা এতদিন প্রায় বন্দি থেকে আমরাও একটু পরিবর্তন চাইছিলাম। অনেক ভাবনা চিন্তা করে দেখলাম পাহাড়ের দিকে যাওয়াই ভাল হবে।

তিব্বত সীমান্ত ঘেষা কিন্নরের কথা কিছু পড়েছিলাম, কিছু বন্ধুদের কাছে শুনেছিলাম। রাস্তাঘাট একটু দুর্গম হলেও এখানকার   অতুলনীয় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে এই অঞ্চল পর্যটকদের কাছে খুবই আকর্ষণীয়।  অ্যাডভেঞ্চার-প্রিয় তরুণরাও এখানে আসছে ট্রেকিং-এর জন্য।  সিমলার মতো ট্যুরিস্টের “ঢল” এখানে নামেনা। তাই, যাঁরা নির্জনতা ও প্রকৃতি ভালবাসেন, কিন্নর তাঁদের ছুটি কাটানোর আদর্শ জায়গা। 

কলকাতার একটা ট্যুর কোম্পানীর সঙ্গে আমরা আগে কয়েকটা জায়গায় বেশ আরামে ঘুরেছিলাম। ওঁদের কিন্নরের ভ্রমণসূচিটাও আমাদের পছন্দ হল।  তাই তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করে ২২শে অক্টোবর দিল্লি জংশন থেকে নেতাজী এক্সপ্রেসে উঠলাম।

আড়াই ঘন্টা লেটে ট্রেন যখন চন্ডীগড় পৌঁছল তখন রাত তিনটে। আমাদের মূল দলটা এই ট্রেনেই সফর করছিল, কিন্তু তার সঙ্গে আমরা যোগদিলাম চন্ডীগড়ে।  আমাদের দলে যাত্রী সংখ্যা ছিল চব্বিশ। দুই ম্যানেজার, রান্নার লোক এবং সাহায্যকারীদের নিয়ে মোট তিরিশ জন।

তিনটে টেম্পো ট্রাভেলারের মাথায় সকলের  লাগেজ এবং অন্যান্য জিনিসপত্র তুলে রওয়ানা দিতে দিতে সাড়ে চারটে বেজে গেল।  গন্তব্য ১১৩ কিমি দূরে সিমলা।  সারা রাত প্রায় জেগে কাটানোয় গাড়ি চলতে শুরু করতেই চোখ জুড়িয়ে এল। সে ঘুম ভাঙল, যখন একটা প্রায় নব্বই ডিগ্রি  খাড়া রাস্তাদিয়ে আমাদের গাড়ি সশব্দে হোটেলের পার্কিং-এ এসে দাঁড়াল । ঘড়িতে তখন সাড়ে আটটা।  

সিমলা আমাদের ভ্রমণ-সূচীতে থাকলেও আসলে কিন্নর যাওয়ার পথে এটা অনেকটা “ট্রানজিট হল্ট”।  তাই এখানে ঘোরাটা উপরি পাওয়া ফাউ-এর মতো। সকাল সন্ধ্যে মিলিয়ে কয়েক ঘন্টায় সিমলার  বিখ্যাত কালীবাড়ি দেখা ও ম্যালে কয়েক চক্কর দেওয়া ছাড়া অন্য কোথাও যাওয়ার সময় ছিলনা।  আর দুটো জায়গাই আমাদের হোটেল থেকে কয়েক মিনিটের হাঁটা পথ। তাই ব্রেকফাস্টের পরেই আমরা দুজন দলছুট হয়ে বেরিয়ে পড়লাম । 

সিমলার কালীবাড়িটা ছোট, কিন্তু সুন্দর। বিশেষকরে দেবী মূর্তি খুবই আকর্ষণীয়, যদিও ছবি তোলা নিষেধ। বেশ কয়েকটা সিঁড়ি ভেঙে মন্দিরে উঠতে হয়। উপরের খোলা ছাদ থেকে সিমলার দৃশ্য মনোরম।   

সিমলা কালী বাড়ি

সব পাহাড়ি শহরের মতো সিমলার মল রোডটাও লোকজন, দোকানপাট,ঝকঝকে ঘরবাড়ি নিয়ে জমজমাট। এই পথে গাড়ি নিষিদ্ধ হওয়ায় আরামে হাঁটাচলা করা যায়। দিনটা রোদ ঝলমলে, আর ঠান্ডাও খুব বেশি ছিলনা।  ফলে মৃদুমন্দ গতিতে দু’পাশের নানা জিনিসের দোকানপাট দেখতে দেখতে হাঁটাটা বেশ আনন্দদায়ক হয়েছিল।  মল রোডে ব্রিটিশ আমলের কয়েকটা বাড়ি বেশ ভাল অবস্থায় রয়েছে ।  হলুদ রঙের চার্চটাও সুন্দর। 

সিমলার মল
মল রোড

পথের ধারে ছোট্ট একটা পার্ক। এখান থেকে নীচের উপত্যকার দৃশ্য অপুর্ব।  ছবি তোলা ছাড়াও এখানে আমরা আইসক্রীম খেলাম, আর আমার স্ত্রী তার সোয়েটারটা হারালো, আবার খুঁজেও পেল।  মল রোড ট্রাফিক-মুক্ত হলেও সিমলার বাকি রাস্তায় গাড়ির উপদ্রব বিরক্তি জাগায়। তাছাড়া, মল রোড ও তার আশপাশের অংশ বাদ দিলে সিমলাতে অসংখ্য বাড়িঘর – প্রধানতঃ হোটেল – পাহাড়ের সৌন্দর্যকে অনেকটাই ঢেকে দিয়েছে। 

মল থেকে সিমলার দৃশ্য

দলের অন্যান্যদের সঙ্গে পরিচয় হল। পশ্চিমবাংলার বিভিন্ন জেলা থেকে সবাই এসেছেন। কেউ চাকরি করেন, কারোর বা ব্যবসা। খাবার সময় আপেলের আলোচনাই বেশি হ’ল।  প্রায় সবাই দেখলাম কিন্নর থেকে আপেল কিনবেনই। আমাদের ম্যানেজার জানালেন যে আসল আপেল রাজ্য হচ্ছে “কল্পা”। আমরা সেখানে দু’দিন থাকব, এবং আপেল কেনার সুযোগ পাব। 

পরদিন ব্রেকফাস্ট করে আবার গাড়িতে। গন্তব্য সিমলা থেকে ১৬০ কিলো মিটার দূরে সারাহান। প্রায় পাঁচ ঘন্টার পথ।  আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তা, কিন্তু খুব খারাপ বা ভীতিজনক নয়।  মাঝে মাঝে গ্রাম আর বারোগ, ঠিয়োগ, নারকান্ডা, কুমারসাঁই (Kumarsain), রামপুর ইত্যাদি ছোট ছোট শহর। নারকান্ডা বেশ বড় ব্যবসা কেন্দ্র। উচ্চতা প্রায় ন’হাজার  ফুট। এত উচুতে হলেও খুব ঠান্ডা মনে হলনা। অবশ্য তখন বেলা প্রায় বারোটা।  এখানে কিছুক্ষণ যাত্রা বিরতি হল। একটা চায়ের দোকানে গরম গরম শিঙাড়া আর চা খেয়ে একটু গা গরম করে নিলাম। 

নারকন্ডা থেকে হিমালয়ের দৃশ্য

দুপুরের খাওয়ার জন্য থামা হল কুমারসাঁইতে। খাবার সঙ্গেই ছিল। খুব ভোরে উঠে আমাদের রান্নার লোকেরা সব কিছু তৈরি করে বড়বড় টিফিন ক্যারিয়ারে ভরে নেয়।  শুধু পথের ধারেএকটা ধাবাতে গরম করে পরিবেশন করা হল। যতক্ষণ খাবার গরম হচ্ছিল, আমরা এদিক ওদিক ঘুরে কিছু ছবি তুললাম।  গরম গরম ভাত, ডাল, তরকারি আর মাছের ঝাল দিয়ে লাঞ্চটা হল চমৎকার। এখানে মাছ কোথায় পেলেন প্রশ্ন করে জানলাম চন্ডীগড় থেকে মাছ কিনে বরফ-দেওয়া বাক্সে ভরে রাখা হয়েছিল। তবে এই যাত্রায় এটাই শেষ মাছ খাওয়া।

সারাহানে পৌঁছতে সন্ধ্যে হয়ে গেল, আর শুরু হল বৃষ্টি। সারাহান সাড়ে সাত হাজার ফুটেরও বেশি উচ্চতায়, এবং বেশ ঠান্ডা। তবে হোটেলের ঘরে হিটার থাকায় ঠান্ডায় কষ্ট হয়নি। হোটেলের লবিতে দেখলাম বরফে ঢাকা পাহাড়ের ছবি। রেঞ্জটার নাম শ্রীখন্ড। হোটেলের নামও তাই।  সন্ধ্যেবেলায় আর বাইরে গেলাম না।

সারাহানে দেখার জিনিস দুটো – ভীমাকালী মন্দির এবং “শান্তি কুঞ্জ” নামে এখানকার রাজবাড়ি। আর দুটো জায়গাই আমাদের হোটেল থেকে এক মিনিটের পথ। যেহেতু দুপুরের খাওয়ার পর আমরা সারাহান থেকে রওয়ানা দেব, আমাদের হাতে অনেক সময় থাকবে।

পরদিন ঘুম ভাঙল খুব ভোরে। ক্যামেরা নিয়ে বেরিয়ে দেখি সামনেই দুধ-সাদা শ্রীখন্ডের শিখরে প্রভাত-সূর্যের প্রথম কিরণ ছড়িয়ে পড়ছে, গলানো সোনার রং লাগছে বরফে, এক অপূর্ব আভায় ভরে উঠছে আকাশ।  ধীরে ধীরে “আকাশতলে উঠল ফুটে আলোর শতদল”।

ভোরের শ্রীখন্ড

এদিন সকালের জলখাবার একটু তাড়াতাড়ি খাওয়া হল, কারণ বেলা দু’টোর মধ্যে পরবর্তী “পঢ়াও”-এর দিকে রওয়ানা হতে হবে।  মালপত্র ম্যানেজারের জিম্মা করে দিয়ে আমরা চললাম ভীমাকালী মন্দিরে। প্রথমে একটা উঠোন। তার একধারে শিব মন্দির।  অন্যদিকে যাত্রীনিবাস ও ক্যান্টিন। আর এক দিকে সম্ভবতঃ পুরোহিত এবং অন্যান্য কর্মচারিদের থাকার জায়গা। 

ভীমা কালী মন্দিরের প্রবেশ পথ
শিব মন্দির
মন্দিরের অপূর্ব গঠনশৈলী
মন্দির প্রাঙ্গণ

উঠোন থেকে কয়েক ধাপ উঠে মূল মন্দিরের দরজা। দরজাটা বেশ বড়। তার কাঠের উপরে কিছু কারুকার্য । দরজা দিয়ে ঢুকে আর একটা উঠোন।  এখানে জুতো রাখার জায়গা। চামড়ার কোন জিনিস, ক্যামেরা ইত্যাদি নিয়ে মন্দিরে ঢোকা নিষেধ। অবশ্য সেসব রাখার জন্য লকারের ব্যবস্থা রয়েছে। 

সরু সিঁড়ি দিয়ে উঠে তিনতলায় “গর্ভগৃহ”।  ছোট একটা ঘরের মধ্যে আবছা আলোয় আমার মনে হল  কালীর যে রূপগুলির সঙ্গে আমরা পরিচিত এ মূর্তি সেরকম নয়।  মন্দিরের অপর এক তলায় রয়েছে পার্বতী বা ভগবতীর মূর্তি এবং নীচে ভৈরবের স্থান।  

মন্দিরটার গঠন আমাদের চেনা বাংলা, উত্তর বা দক্ষিণ ভারতের অন্যান্য মন্দিরের থেকে আলাদা। কাঠ ও পাথরের তৈরি, প্যাগোডার ছাঁদে।  কার্নিসে কাঠের উপর সুক্ষ্ম খোদাইয়ের কাজ।  শিব মন্দিরটা অবশ্য আমাদের পরিচিত উত্তর ভারতীয় “নাগর” ধাঁচেই তৈরি।  মেঘমুক্ত আকাশ আর বরফে ঢাকা শৈলমালার পশ্চাদপটে অপূর্ব এক দৃশ্য। 

ভীমাকালী মন্দিরের প্রাচীনত্ব সম্বন্ধে তেমন কিছু জানা যায়না। সারাহান ছিল বুশহর নামে এক স্বাধীন রাজ্যের রাজধানী। এই রাজবংশের আরাধ্যা দেবী ছিলেন “মা ভীমাকালী”।  পরে রাজধানী রামপুরে স্থানান্তরিত হলেও রাজারা এই মন্দিরের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন।    

হালে শোনা যাচ্ছে এটি নাকি সতীর একান্ন পীঠের একটি। পুরাণে এর কোন সমর্থন আছে কী না আমার জানা নেই। কিন্তু পীঠস্থান না হলেও দেবী ভীমাকালী অত্যন্ত জাগ্রত বলে স্থানীয়দের বিশ্বাস। এটি একটি প্রসিদ্ধ তীর্থস্থান এবং বিভিন্ন উৎসবে, বিশেষ করে নবরাত্রের সময় এখানে অসংখ্য দর্শনার্থী্র সমাগম হয়। 

মন্দির থেকে বেরিয়ে যে গলিপথটা সারাহান গ্রামের দিকে চলে গেছে তার পাশেই এখানকার রাজবাড়ি।  বাড়িটা কাঠের তৈরি, এবং রাজার বাড়ি হিসেবে ছোট হলেও ভারী সুন্দর।  এখানে ঢোকায় কোন বাধা নেই, কিন্তু ভিতরের ঘরগুলো সব তালাবন্ধ।  সুন্দর একটা বাড়ি এরকম পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে আছে দেখলে দুঃখ হয়।  হেরিটেজ হোটেল হওয়ার জন্য বাড়িটা আদর্শ। হয়তো কোনদিন তাই হবে!

রাজবাড়ির সামনে সবুজ লন। লনের একধারে একটা ফলে-ভরা নাসপাতি গাছ। লন পেরিয়ে কাঠের থামওয়ালা টানা বারান্দা। দোতলায় ওঠার সিঁড়ি বন্ধ। বারান্দার দেওয়ালে “শ্রীখন্ড ভিউ” লেখা ফলক। অতীতে নিশ্চয় রাজপরিবারের সদস্যরা এই বারান্দায় বসে পাহাড়ের দৃশ্য উপভোগ করতেন। সেখানে দুটো বেতের আধভাঙা চেয়ার যেন আমাদের জন্যই রাখা ছিল। নানারকম পাখির ডাক ছাড়া আর কোন শব্দ নেই। চুপকরে বসে বরফ-ঢাকা শৈলশ্রেণী দেখে কিছু সময় কাটিয়ে সারাহানের ছোট্ট বাজার হয়ে হোটেলে ফিরলাম।

শান্তিকুঞ্জ – সারাহানের রাজবাড়ি
রাজবাড়ির উঠোন

এবারে যাত্রা সাংলার পথে। সাংলা প্রায় সাড়ে আট হাজার ফুট উঁচুতে বাসপা (Baspa) নদীর উপত্যকায়।   সিমলা থেকে সারাহানের রাস্তা আঁকাবাঁকা হলেও খুব একটা বিপজ্জনক ছিলনা। কিন্তু এবারের রাস্তার একদিকে খাড়া পাহাড়, আর অন্য দিকে গিরিখাত। কোন কোন জায়গায় পাহাড় কেটে রাস্তা বানানো হয়েছে, কিন্তু উপরের পাথরগুলো ঝুল-বারান্দার মতো পথের উপর ঝুলে আছে। একটা জায়গায় তো একটা খিলানের মধ্যদিয়ে গাড়ি যাওয়ার পথ। কোথাও কোথাও দুটো গাড়ি পাশাপাশি যেতে পারেনা। তাই প্রত্যেক বাঁকে হর্ণ বাজানো এখানে খুবই জরুরি। প্রয়োজনে একটা গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়ে অন্যটাকে যেতে দেয়। ড্রাইভাররা খুবই সতর্ক থাকলেও মাঝে মাঝে পরিস্থিতি এমন হচ্ছিল যে গাড়ি রিভার্স করা ছাড়া গতি নেই। সেই মূহুর্তগুলোতে হৃদপিন্ডের ধুকপুকুনি বেড়ে যাচ্ছিল।

ঝুলন্ত পাথরের নীচ দিয়ে পথ
পাহাড়ের খিলানের ভিতর দিয়ে রাস্তা*

দেখতে দেখতে আমরা এসে পড়লাম কারচেন বলে একটা জায়গায়, যেখানে বাসপা এসে শতদ্রুর সঙ্গে মিলেছে।  এখানে রয়েছে ৩০০ মেগা ওয়াটের “বাসপা ২” জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। শতদ্রু আর বাসপার সঙ্গম-স্থলে বাঁধ দিয়ে বানানো হয়েছে এক বিশাল জলাধার, আর পাহাড়ের গায়ে টানেল করে বসানো হয়েছে টার্বাইন ।  শতদ্রুর উপর এরকম আরও কয়েকটা জল-বিদ্যুৎ প্রকল্প রয়েছে, আর কয়েকটায় কাজ চলছে।   

সাংলার মোনাল রেসিডেন্সি হোটেলে পৌঁছলাম বিকেলের দিকে। এখান থেকে বরফে ঢাকা যে শিখরটা চোখে পড়ে তার নাম জোরকান্ডেন। “কিন্নর-কৈলাস” রেঞ্জের সর্বোচ্চ চূড়া। সাংলার বাজারে এক চক্কর মেরে অল্প কিছু আপেল কেনা হল। খুবই রসালো এবং সুস্বাদু।  রাতে প্রচন্ড ঠান্ডা । তাপমান প্রায় তিন ডিগ্রী। তার মধ্যে সন্ধ্যেবেলা আবার একটু ঝিরঝিরে বৃষ্টি হয়ে গেল। জোরকান্ডেনের দিকে লক্ষ্যকরে হোটেলের এক কর্মচারি বললেন, “উপরে বরফ পড়া শুরু হয়ে গেছে”।  পরদিন চিতকুলে গিয়ে তাঁর কথা যে ঠিক তার প্রমাণ পথের ধারে দেখতে পেয়েছিলাম।

সকালে চমৎকার ঝলমলে আবহাওয়ায় চিতকুলের দিকে রওয়ানা হলাম। বাসপা বরাবর আমাদের সঙ্গ দিয়ে চলল। ভারত-তিব্বত সীমান্তে বাসপার উৎস, আর কারচেনের কাছে শতদ্রুর বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে এর পথ চলা শেষ। নদীর ওপারে ঘন সবুজ ওক আর পাইনের বন।   

চঞ্চলা বাসপা
চোখজুড়ানো বাসপা উপত্যকা
নীল, সাদা আর সবুজের সমাহার
বাসপার নয়নাভিরাম যাত্রাপথ

পথে স্বল্প বিরতি রকচাম বলে একটা জায়গায়। বাসপার ধারে নেমে গেলাম সবাই।  নদীর জল অগভীর, কিন্তু খুব স্রোত। ছোটবড় পাথরে ধাক্কা খেতে খেতে চলেছে। সাদা ফেনা আর আকাশের নীল মিশে  জলে এক অপুর্ব রং।  পাশেই একটা লোহার ঝোলা সেতু। তার উপর দাঁড়িয়ে মনে হল বাসপা যেন দূরের বরফে মোড়া পাহাড় থেকে বেরিয়ে সোজা আমাদের দিকে বয়ে আসছে সবুজ জঙ্গল ভেদ করে।  সেতুর অন্য পারে নদীর ধারে নানা রঙের তাঁবুর সারি পর্যটকদের থাকার জন্য। এখন অবশ্য শূন্য পড়ে আছে। 

রকচামে বাসপার তীরে

পাকা সড়ক শেষ হয়েছে চিতকুলে এসে। অতীতে এই পথ দিয়ে ব্যবসা চলত তিব্বতের সঙ্গে, কিন্তু এখন চিতকুল থেকে তিব্বত সীমান্ত পর্যন্ত সত্তর কিলোমিটার সাধারণের জন্য নিষিদ্ধ – ভারত-তিব্বত সীমান্ত পুলিশের এলাকা।  তবে চিতকুল থেকে ভারতের সীমানার ভিতরে নানা দিকে ট্রেকিং করা যায়।   

চিতকুলের কিছু দৃশ্য

চিতকুলের একদিকে বরফের পাহাড় আর অন্যদিকে বাসপা নদী, সবুজ চারণ-ভূমি আর ফলের বাগান।  সব মিলিয়ে প্রকৃতি এখানে অপরূপা, আর তাই পর্যটকদের কাছে চিতকুলের এত আকর্ষণ। অন্য দর্শনীয় স্থান বলতে এখানকার প্যাগোডা স্টাইলের মথি (Mathi) দেবীর মন্দির আর শ্লেট পাথরের ছাদ-ওয়ালা ঘরবাড়ি। একটি মতে “মথি দেবী” চিতকুলের অধিষ্ঠাত্রী দেবী এবং তিনি ভগবান বদ্রিনাথের স্ত্রী। কিন্নর-কৈলাস পরিক্রমার শেষ হয় এই মন্দিরে পুজো দিয়ে। মন্দির বন্ধ থাকায় আমাদের দেবী-দর্শনের সৌভাগ্য হয়নি।

চিতকুলের মথি (Mathi) মন্দির
মন্দির চত্বর

এগারো হাজার তিনশ’ ফুট উচ্চতায় চিতকুল গ্রামটা খুবই ছোট। একটা গণনা অনুযায়ী এখানকার জনসংখ্যা হাজারের কাছাকাছি।  কিন্তু এখানে কেউ স্থায়ীভাবে থাকেনা। শীতের কয়েকটা মাস যখন এখানকার সবকিছু বরফে ঢাকা পড়ে যায়, তখন এখানকার অধিবাসীরা নীচের দিকে নেমে যায়। আবার বরফ গললে ফিরে আসে।  এবারে আমরাই ছিলাম সম্ভবতঃ শেষ পর্যটক দল। 

এই অঞ্চলে ভারতের শেষ গ্রাম
চিতকুল গ্রামের রাস্তা

পর্যটকের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে হোটেলের সংখ্যাও।  কিন্তু এসব যারা বানিয়েছে, আর যে সরকারি বিভাগ এদের অনুমতি দিয়েছে তাদের সৌন্দর্যজ্ঞান না থাকায় এই “বিকাশ” হয়েছে পরিকল্পনাহীন ও খাপছাড়া।  অথচ এই জায়গাটায় সহজেই গড়ে তোলা যেত চমৎকার একটা পর্যটন কেন্দ্র, এখানকার পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে এবং স্থানীয় স্থাপত্য-শৈলিকে মর্যাদা দিয়ে।

ভারতের “শেষ ঢাবা”তে কফি খেয়ে ফিরে এলাম সাংলায়।

পরদিন যাত্রা করলাম আমাদের শেষ গন্তব্য কল্পার উদ্দেশ্যে। পথ একই রকম কিন্ত আরও একটু সরু। পথে রেকংপেওর বাজারে থামা হল।  এই বাজারটা খুব বড় আর ব্যস্ত। আমাদের মধ্যে অনেকেই এখান থেকে কম্বল কিনলেন।  এখানে কুলু শাল এবং পশমের অন্যান্য জিনিস পাওয়া যায়। বাস স্ট্যান্ডের পাশে দেখি অনেক লোক বড় বড় ওজন করার মেশিন নিয়ে বসে আছে।  জিজ্ঞাসা করে জানলাম যে আশপাশের গ্রাম থেকে চিলগোজা নিয়ে বিক্রেতারা আসবে, আর এরা কিনবে। চিলগোজা হচ্ছে পাইনের বাদাম। সংগ্রহ করা কঠিন, ফলে দামও খুব বেশি। রেকংপেওতে লক্ষ্য করলাম এখানকার পুরুষ ও মহিলারা মাথায় পড়েছে গোল একধরণের টুপি, যার সামনের দিকটা সবুজ রঙের। মেয়েদের মধ্যে অনেকে মাথায় একটা বড় স্কার্ফ বা রুমাল বেঁধেছে।

রেকংপেও বাজার *

রেকংপেও থেকে কল্পা সামান্য কয়েক মাইলের পথ। এখানে আমরা উঠলাম “কিন্নর ভিলা” বলে সুন্দর একটা হোটেলে । এর সব ঘর থেকেই দেখা যায় “কিন্নর-কৈলাস” রেঞ্জের তুষারাবৃত সব শিখর, যেন সামান্য একটু হাঁটলেই পৌঁছে যাব সেখানে।  হোটেলের বিরাট খোলা ছাদে রোদে বসে পাহাড় দেখেই কাটিয়ে দেওয়া যায় অনেকটা সময়।

কিন্নর কৈলাস রেঞ্জের একাংশ

লাঞ্চের পর দলের অন্য সকলে যখন ছাদে রোদ পোহাচ্ছে, আমরা দুজন বেরিয়ে পড়লাম গ্রামটা দেখতে।  উদ্দেশ্য ছবি তোলা এবং এখানকার বিখ্যাত সোনালী বা লাল আপেল কেনার ব্যাপারে খোঁজ খবর নেওয়া।  আপেল এখানে অজস্র, কিন্তু সেসবই বড় বড় ব্যাপারীরা আগাম কিনে রেখেছে। ট্রাকে বোঝাই হয়ে সেগুলো যাচ্ছে  এখানকার মানুষের ভাষায় “কারখানায়”।  সেখানে আপেলের সাইজ অনুযায়ী ভাগ করে এবং বাক্সে ভরে তাদের পাঠানো হবে দেশের অন্যত্র এবং বিদেশে। 

কল্পার আপেল বাগিচা
কিন্নরের বিখ্যাত লাল আপেল

দেখলাম প্রায় সব আপেলই পাড়া হয়ে গেছে। কয়েকজন চাষি নিজেদের জন্য কিছু রেখেছেন।  তাঁরা আমাদের আপেল খেয়ে দেখার আমন্ত্রণ জানালেন, কিন্তু বিক্রী করবেন না।  নিরাশ হয়ে হোটেলে ফিরলাম। 

সূর্যাস্তের আগে কল্পা গ্রাম

চিতকুল এগারো হাজার ফুটের উপরে, আর কল্পার উচ্চতা ন’হাজার সাতশ ফুটের বেশি। কিন্তু চিতকুলে আমরা গিয়েছিলাম একটু বেলায়, রোদের মধ্যে। ফলে থার্মোমিটার সাত ডিগ্রী দেখালেও আমরা অতটা বুঝতে পারিনি, যদিও সেখানে আগের দিনই বরফ পড়ে ছিল।  কল্পাতে ওয়েদার রিপোর্ট যদিও দেখাচ্ছিল পাঁচ ডিগ্রী, বিকেল হতেই হাড় কাঁপানো শীত। বিকেলের অস্তগামী সূর্যের আলো কিন্নর-কৈলাশের শিখরে শিখরে প্রতিফলিত হয়ে যে  অনৈসর্গিক দৃশ্য সৃষ্টি করেছিল তার জন্য আমি এর চাইতে আরও বেশি শীত সহ্য করতে রাজি।     

সূর্যাস্তের সময় কিন্নর কৈলাস
ধ্যানগম্ভীর শৈলশিখর
পড়ন্ত রোদে বরফের পাহাড়

পরদিন ভোরে – তাপমাত্রা তখন এক ডিগ্রী সেলসিয়াস – প্রথমে ছাদ, পরে আমাদের বারান্দা থেকে সুর্যোদয়ের ছবি তোলা গেল। উত্তরাখন্ডের মুন্সিয়ারিতে পঞ্চচূল্লীর অপূর্ব দৃশ্য পেয়েছিলাম; কিন্তু এখানে শৃঙ্গগুলো যেন আরও কাছে। দিগন্তের একপ্রান্ত থেকে আর এক প্রান্ত পর্যন্ত বরফে ঢাকা গগনচূম্বী সব শিখর।

সূর্য ওঠার আগে
সূর্যোদয়ের মুহুর্তে

ভক্তদের কাছে কিন্নর-কৈলাসের মাহাত্ম এবং পবিত্রতা আসল কৈলাসের চেয়ে কম নয়।  জোরকান্ডেন (২১,২৩৭ ফুট)  এই পর্বতমালার সবচেয়ে উঁচু শিখর।  যার নামে এই পর্বতশ্রেণীর নাম, সেই  কিন্নর-কৈলাস চুড়াটি কিন্তু একটু কম উচ্চতার, ১৯,৮৪৯ ফুট। এই শৃঙ্গটির বিশেষত্ব হচ্ছে এর মাথায় দাঁড়িয়ে থাকা ৭৯ ফুট উঁচু একটা খাড়া প্রস্তরখন্ড, যেটি একটু লক্ষ্য করলেই চোখে পড়ে।  এই “শিবলিঙ্গ”ই হচ্ছেন কিন্নর-কৈলাস মহাদেব। এর একটু নীচেই আছে পার্বতী কুন্ড (১৪,৯০০ ফুট)।

কিন্নর কৈলাসের শিবলিঙ্গ
(মাঝের চূড়াটা)
জোরকান্ডেন শিখর

মানুষের বিশ্বাস, এই কুন্ড, কিন্নর কৈলাশ শৃঙ্গ এবং আশেপাশের প্রস্তরময় অঞ্চলটি মহাদেব এবং পার্বতীর লীলাভূমি।  প্রতি বছর বহু পূণ্যার্থী এই দুর্গম  কিন্নর কৈলাশ পরিক্রমা করেন। তবে ধর্মীয় মাহাত্মের কথা বাদ দিলেও এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তুলনাহীন।  কল্পার একমাত্র বড় রাস্তার উপর দাঁড়ালে দেখা যায় তিনটি স্তর – উপরে আকাশছোঁয়া বরফ-সাদা পাহাড়ের শ্রেণী। তার নীচে ঘন সবুজ বনানী আর তার পরে গ্রামের ঘরবাড়ি আর আপেলের বাগান ও সবজির ক্ষেত।  শিব-পার্বতীর লীলাভূমির আদর্শ স্থান।

নীল সাদা সবুজের অপরূপ দৃশ্য

পরদিন কল্পা  এবং আশেপাশের গ্রামের কয়েকটা মন্দির আমরা দলবেঁধে দেখলাম। প্রথমেই গেলাম ব্রেলিঙ্গি বৌদ্ধ মঠে। মঠটা কল্পা থেকে সামান্য দূরে। বড় রাস্তা থেকে কিছুটা উপরে উঠতে হয়।  মঠটির চোখে পড়ার মতো কোন বৈশিষ্ট্য নেই।  মন্দিরের বাইরে একপাশে রয়েছে বিরাট বুদ্ধ মূর্তি। মঠের ভিতরে বৌদ্ধ দেবদেবীর মূর্তির সামনে ধূপ ধরানো হয়েছে দেখলাম। একধারে ফ্রেমে বাঁধানো বর্তমান দলাই লামার ছবি ।

এর পরে আমরা গেলাম কল্পা (পুরনো নাম ‘চিনি গ্রাম’) গ্রামের ভিতরে প্রাচীন লোচাওয়া বৌদ্ধ মন্দিরে। মন্দিরের চারদিকে তিব্বতী ভাষায় মন্ত্র লেখা প্রার্থনা-চক্র। ভিতরে নানা বৌদ্ধ দেবদেবীর মূর্তির সামনে ঘিয়ের প্রদীপ জ্বলছে।  শুনলাম এটি বৌদ্ধ মন্দির হলেও এখানে নারায়ণের পুজোও হয়।  মন্দিরের বাইরে প্রাঙ্গণের একধারে ভক্তেরা অনেক প্রদীপ জ্বালিয়ে দিয়েছে। প্রসাদ হিসাবে আমাদের বিস্কুট ও ক্যান্ডি দেওয়া হল। 

বৌদ্ধ মন্দিরের কাছেই “নারায়ণ-নাগিনী” মন্দির। মন্দির সেই একই প্যাগোডা শৈলীতে কাঠ ও পাথর দিয়ে তৈরি।  ছাদ স্লেট পাথরের।  মন্দিরের কাঠের কাজ অপূর্ব, আর এখান থেকে কিন্নর-কৈলাশের দৃশ্য অপরূপ। 

মন্দির দেখে ফেরার পথে দেখি কোন এক “রায় বাবু” এখানে বাঙালি খাবারের “হোটেল” খুলে বসেছেন। সময়াভাবে তাঁর সঙ্গে আলাপ করা হল না।  কিন্তু মনে মনে তাঁকে প্রশংসা করলাম। এরকম প্রত্যন্ত এক জায়গায় পোস্ত-ভাত, মাছ এবং অন্যান্য লোভনীয় সব পদ মেনুতে রাখা কি চাট্টিখানি কথা!   আসলে এইসব অঞ্চলে পর্যটকদের সিংহ ভাগই বাঙালি। স্থানীয় মানুষজনও প্রায় একশ ভাগ আমিষভোজী। কাজেই, রায়বাবু ভেবেচিন্তেই হোটেলটি খুলেছেন। 

বৌদ্ধ মন্দির, কল্পা (চিনি গ্রাম)

মন্দির পরিক্রমায় আমাদের শেষ গন্তব্য ছিল রোঘি গ্রামের হিন্দু মন্দির। পথে একটা দর্শনীয় স্থান “সুইসাইড পয়েন্ট”। একদিকে আকাশছোঁয়া পাহাড়ের দেওয়াল, আর অন্যদিকে অতলস্পর্শী খাদ যেখানে কয়েক হাজার ফুট নীচে শতদ্রু বয়ে চলেছে।  মাঝে একফালি সঙ্কীর্ণ পীচের রাস্তা। ভারতের প্রায় সব হিল স্টেশনেই একটা “সুইসাইড পয়েন্ট” থাকে। এখানে আমরা জায়গাটা দেখলাম গাড়ির ভিতর থেকে, যেহেতু এখানে গাড়ি থামাবার কোন উপায় ছিলনা।  আমি ও আমার স্ত্রী ঠিক করলাম যে দুপুরে খাওয়ার পরে হোটেল থেকে আড়াই কিলোমিটার হেঁটে এসে এখানটা ভাল করে দেখব। 

রোঘি গ্রামের মন্দির

রোঘির মন্দিরটাও এখানকার রীতি মেনে কাঠের তৈরি। ঘন নীল আকাশ আর তুষার-ধবল কিন্নর-কৈলাশের পশ্চাদপটে মন্দিরের চূড়াগুলোর দৃশ্য ভারী সুন্দর।  এটি একটি গ্রামদেবতার মন্দির বলে আমার মনে হল। স্থানীয় কেউ এখানে কোন দেবতার পূজা হয় তা পরিস্কার বোঝাতে পারলেন না।

দুপুরে বিশ্রাম নিয়ে নষ্টকরার মতো সময় আমাদের ছিলনা। তাই চললাম সুইসাইড করার আদর্শ জায়াগাটা দেখতে।  সাপের মতো আঁকাবাঁকা রাস্তা। সামান্য চড়াই-উৎরাই ।   আকাশ যেরকম নীল সেরকমটা দিল্লির মতো ধূলোভরা শহরে কল্পনাই করা যায় না।   সেই নীলের পটভূমিতে দুপুরের রোদে বরফ-ঢাকা চূড়াগুলো ঝকঝক করছে। তাপমাত্রা সাত ডিগ্রী, কিন্ত ডান দিকের খাড়া পাহাড়ের ছায়া সরে গেলেই  রোদ্দুরে মাথার চাঁদি ফেটে যাবার অবস্থা।একজায়গায় পথটা গেছে ছায়াঘেরা বিশাল বিশাল দেবদারুর বনের মধ্য দিয়ে।  আমাদের বাঁদিকে শতদ্রু এত  নীচ দিয়ে বয়ে চলেছে, চেষ্টা করেও তাকে দেখতে পেলাম না। জনহীন পথে দু-একটা গাড়ি। মাঝে মাঝে মানুষের আওয়াজ অবশ্য ছিল।  কিন্তু একজন মাত্র লোককে দেখা গেল।

রোদ্দুরে চাঁদি ফাটার জোগাড়
কোথাও দেবদারুর ছায়ায় ছায়ায় পথ
সুইসাইড পয়েন্টের রাস্তা
কয়েক হাজার ফুট গভীর খাদ, উপরে রাস্তা
অনেক নীচে শতদ্রুর জলধারা

ধীরে সুস্থে আধঘন্টার মধ্যে আমরা পৌঁছে গেলাম “সুইসাইড পয়েন্টে”।  এখানে একটু উঁচু করে রেলিং দেওয়া, আর “আই লভ কিন্নর’ লেখা হোর্ডিং।   এই জায়গাটায় খাদের দেওয়াল এতটাই খাড়া আর গভীর যে ঝুঁকলে মাথা ঘুরে যায়।  রোদ থেকে বাঁচার জন্য আমরা একটু এগিয়ে গেলাম রাস্তার বাঁকের দিকে, যেখানে পাহাড়ের ছায়া পড়েছে।  এখানে উপলব্ধি করলাম যে একটা বিশেষ জায়গাকে “সুইসাইড পয়েন্ট” বলা ভুল, কারণ এই পুরো রাস্তাটাকেই “সুইসাইড রোড” বললে নামকরণটা সার্থক হতো। 

গুরুভোজনের পরে এই পাঁচ মাইল হাঁটাটা আমাদের ব্যর্থ হয়নি, কারণ এরকম ভয়ঙ্কর সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্য গাড়ির কাচের মধ্য থেকে উপভোগ করা যায় না।  এ ছাড়াও আরও দুটো কারণে এই মধ্যাহ্ন-ভ্রমণ সার্থক হয়েছিল ।  কিন্নরে শেষ রাত বলে ডিনারে ছিল এলাহি বন্দোবস্ত। যদি দুপুরের খাওয়াটা হেঁটে হজম না করতাম তাহলে গ্র্যান্ড ফিস্টের পদগুলোর আস্বাদন থেকে বঞ্চিত হতাম। 

অন্য কারণটায় আসি। প্রবাদ, কপালে ঘি না থাকলে হাজার মাথা ঠুকলেও তা পাওয়া যায় না।  এর উল্টোটাও যে সত্যি তার প্রমাণ পেলাম এই অসময়ে হাঁটাহাঁটি করার ফলে।  প্রায় হোটেলে ফিরে এসেছি এমন সময় দেখি আমাদের তিন গাড়িচালকও কল্পা গ্রামের দিক থেকে এগিয়ে আসছে।  তাদের প্রশ্নের উত্তরে বলতেই হল যে প্রথম দিকে আপেল কেনায় অনীহা দেখানোয় এখন আমাদের বোধহয় কিন্নরের আপেল দিল্লিতেই কিনতে হবে।  ওরা বলল যে ওরাও সামান্যই কিনেছে, এবং আরও কিছু কেনার ফিকিরে ঘুরছে।  আরও জানা গেল যে রোঘি গ্রামে জনৈক নেগিবাবুর কাছে কিছু আপেল, এবং আখরোটও পাওয়া যাওয়া যেতে পারে। সেইমতো গাড়ি করে রোঘি গিয়ে সেই নেগি সাহেবের দোকান পাওয়া গেল, কিন্তু আপেল আমাদের পছন্দ হলনা।  উনি তখন বললেন যে ওঁর বাড়িতে সদ্য পাড়া আপেল রয়েছে, যেগুলো ভাল সাইজের। 

আমরা ড্রাইভারদের উপর ছেড়ে দিলাম আপেল পছন্দ করে কেনার ভার, কারণ তখন আমাদের আর “সামান্য ১৫০টা সিঁড়ি উপরে” ওঠার অবস্থা নেই।  ওরা আমাদের বিশ্বাসের মান রেখেছিল।  দিল্লির বন্ধুরা সেই আপেলের স্বাদের যার পর নাই প্রশংসা করেছিলেন। কিন্নরের আখরোটও খুব সুস্বাদু।  কাশ্মীর বা অন্যান্য জায়গার আখরোটের মতো শক্ত নয়। হাতের মুঠো দিয়ে একটু ঠুকলেই খোলটা ভেঙে দিব্যি ভিতরের বাদামটা বেরিয়ে আসে। 

কিন্নর ভ্রমণ শেষ হল ।  পরদিন সিমলার পথে রামপুরের কাছে  ভদ্রাস বলে একটা জায়গায় রাত কাটিয়ে চন্ডীগড় হয়ে দিল্লি।  যদিও কিন্নরের অনেক কিছু অদেখা রয়ে গেল,  এ পর্যন্ত দেখা ‘ হিমালয়ের” সবচেয়ে সুন্দর জায়গাগুলোর মধ্যে অন্যতম কিন্নর আমাদের স্মৃতিতে বহুদিন অম্লান থাকবে ।

********

ছবিঃ

  • রেকংপেও বাজা্র – স্টীভ বেনেট (ইন্টারনেট থেকে)
  • খিলানের নীচদিয়ে পথ – ইন্টারনেট থেকে
  • অন্যান্য ছবি নিজস্ব